ভারতে সম্পত্তি বিভাজন আইন, জানুন সবকিছু – Property Partition Law in India

ভারতে একজন ব্যক্তির সম্পত্তি ভাগ অথবা বিভাজন করা হ্য পার্টিশন অ্যাক্ট (১৮৯৩) অনুযায়ী। একজন উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী তার সম্পত্তির মালিকানা দাবি করতে পারেন।

কিন্তু একজন ব্যক্তি তার সম্পত্তি কার কার ভিতর কিভাবে বটন করবেন তা তার ব্যক্তিগত ইচ্ছার উপরও নির্ভর করে। ধর্ম এবং বর্ণ বিভেদেও সম্পত্তি বিভাজন প্রক্রিয়া ভিন্ন হয়ে থাকে।

Property Partition Law in India
Property Partition Law in India

সাধারণ নিয়মে সম্পত্তি ভাগ করা ছাড়াও কিছু পেটেন্ট, স্বত্ত্ব, আবিষ্কারের মালিকানা ও স্বত্ত্ব ও ভারতীয় সম্পত্তি বিভাজন আইনানুযায়ী ভাগ করা হয়ে থাকে। এসব ক্ষেত্রে আইন অনুসারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সুপ্রিয় পাঠক, আমাদের আজকের আয়োজনে থাকছে ভারতে সম্পত্তি বিভাজন প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা। চলুন দেরী না করে মূল আলোচনায় যাওয়া যাক।

ভারতে সম্পত্তি বিভাজন আইন

রায়চাঁদ বনাম দত্ত মামলার রায়ের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে যে, “সম্পদ শব্দটির সর্বাধিক বিস্তৃত অর্থ হচ্ছে, ব্যক্তির ব্যক্তিগত অধিকার ব্যতীত সকল আইনী অধিকার যা তার অবস্থান বা ব্যক্তিগত অবস্থা গঠন করে”।

ভারতের মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট আরসি কুপার বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া মামলার রায়ের ক্ষেত্রে সম্পত্তি ধারণাটির ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সম্পত্তি বলতে স্থাবর জিনিস যেমন জমি, আসবাব, যত্রপাতি যেমন অন্তর্ভুক্ত তেমনি অনুলিপি,কপিরাইট এবং পেটেন্ট এর মতো অস্থাবর বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ভারতে, বিভিন্ন আইন রয়েছে যা ভারতে সম্পত্তি বিভাজন নিয়ে কাজ করে। সম্পত্তি বিভাজনের বিখ্যাত আইনগুলো হল সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২, পার্টিশন অ্যাক্ট, ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন ইত্যাদি।

এই আইনগুলো দিয়ে ভারতে কিভাবে সম্পত্তি বিভাজন করা হয় তা আমাদের আজকের আলোচনার মূল বিষয়বস্তু।

পার্টিশন অ্যাক্ট- ১৮৯৩

ভারতে পার্টিশন অ্যাক্টের অধীনে কোন কোম্পানির শেয়ারহোল্ডাররা যদি কোম্পানি বিলোপের সময় মামলা করে যদি,

আদালতে উপস্থিত হয়ে দাবি করে যে, সম্পত্তি বিভাজন যুক্তিসঙ্গতভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না, বা সম্পত্তি বিক্রয় আরও বেশি সুবিধাজনক হবে যদি তার দায়িত্ব আদালত গ্রহন করে তবে আদালত আগ্রহী শেয়ারহোল্ডারদের অনুরোধে, সম্পত্তি বিক্রয় এবং লভ্যাংশ বিতরণের দায়িত্ব সরাসরি গ্রহন করে থাকে।

এই আইনে বিধান করা হয়েছে যে শেয়ারহোল্ডার পক্ষের শেয়ারের ন্যয়সঙ্গত বন্টন, শেয়ারের মূল্য, অন্যান্য সম্পত্তির ন্যায্যমূল্য প্রথমে শেয়ারহোল্ডাররা ঠিক করবেন, পরে আদালত ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ করে শেয়ারের পুনঃমূল্য ধার্য করবেন যাতে এ নিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে কোন বিবাদের অবকাশ না থাকে।

এছাড়া উক্ত আইনের অধীনে দুইজন শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে কিভাবে সেই বিরোধ নিষ্পত্তি করা হবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত বিধান রয়েছে।

ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন- ১৯২৫

ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন দুটি ধরণের উত্তরাধিকারের সাথে সম্পর্কিত: টেস্টামেন্টারি বা উইলের মাধ্যমে উত্তরাধিকার এবং ধর্মীয় উত্তরাধিকার।

টেস্টামেন্টারি উত্তরসূরি নির্ধারণ করা হয় যেখানে কোনও ব্যক্তি ‘উইল’ নামে একটি লিখিত দলিল তৈরি করেন সেখানে উল্লেখ থাকে উক্ত ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার সম্পত্তি কে বা কারা পাবে অথবা অন্য কোথায় যাবে।

অনেকেই তার সম্পত্তি ওয়ারিশগণের মধ্যে বন্টন না করে বিভিন্ন চ্যারিটেবল ফান্ড অথবা অন্য কোন অর্গানাইজেশন এ দান করে যান উইলের মাধ্যমে।

তবে উইল জাতীয় লিখিত দলিল না থাকলে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তি তাঁর ধর্মীয় আইন অনুসারে বিভাজন করা হয় এবং এটি ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী সম্পন্ন হয়, যা কিনা ধর্ম অনুযায়ী বিভিন্ন হয়ে থাকে।

যদি কোনও ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইন প্রয়োগ না হয় তবে ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন প্রযোজ্য হবে। এটা হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ধর্মের মানুষের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।

খ্রিস্টধর্মের ক্ষেত্রে, উত্তরাধিকারীদের ধর্ম বিবেচ্য নয়, তবে যে ব্যক্তি মারা গেছে অর্থ্যাৎ যিনি উইল করেছেন তাকে অবশ্যই তার মৃত্যুর তারিখে খৃষ্টান হিসেবে মৃত্যুবরণ করতে হবে।

খ্রিস্টিয় নিয়মে সম্পত্তি ভাগের ক্ষেত্রে দত্তক নেওয়া সন্তানেরা জৈবিক সন্তানের মতো সম্পত্তির ভাগ পাবেনা।

হিন্দু উত্তরাধিকার আইন

ধর্ম অনুসারে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন হিন্দুদের সম্পত্তি বিভাজনের নিয়ম নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। আইন অনুসারে,হিন্দু ধর্মের অনুসারী যে ব্যক্তি অন্য কোনও ধর্মে ধর্মান্তরিত হন তিনি এরপরেও পৈতৃক সম্পত্তিতে তার অংশ দাবি করতে পারেন।

তবে পূর্বে এমন পরিস্থিতি ছিল না। পূর্বে, যদি কোনও ব্যক্তি হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে বা অন্য ধর্মে ধর্মান্তরিত হতেন তবে তিনি পৈতৃক সম্পত্তিতে তার অধিকার দাবি করতে পারতেন না।

তবে পরবর্তীতে সকলের সমঅধিকারের বিষয়টি চিন্তা করে আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে। তাই এখন ধর্মান্তরিত ব্যক্তিরাও আইনানুযায়ী সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে সুরক্ষিত এবং সমঅধিকারপ্রাপ্ত হবেন।

তবে ধর্মান্তরিত ব্যক্তির বংশধরদের বিষয়ে আইনে আছে তারা যদি উত্তরাধিকার সূচনার সময় হিন্দু না থাকেন তবে হিন্দু আইনে তারা পিতৃসম্পত্তির উপর তাদের অধিকার পাবেন না।

মুসলিম সম্পত্তি আইন (শরীয়ত) আইন-  ১৯৩৭

মুসলিম সম্পত্তি আইনে পিতার সম্পদের উপর পুত্র-কন্যা উভয়ের দাবি রয়েছে। পুত্র পাবেন পিতার সম্পদের অর্ধেক, কন্যা পাবেন ৪ ভাগের একভাগ। স্ত্রী জীবিত থাকলে তিনিও স্বামীর সম্পদের কিছু অংশ পাবেন।

ধর্মান্তরিত হলেও পুত্র বা কন্যা পিতার সম্পদের ভাগ দাবি করতে পারবেন। সন্তান বিবাহিত হলেও সম্পদের দাবি করতে পারবে। কোন কারণে সন্তান মারা গেলে তার পুত্র-কন্যারা সম্পত্তির ভাগিদার হবেন।

এছাড়া যার কোন ওয়ারিশ নেই তার সম্পদ নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বন্টন হবে। তবে ব্যক্তিগত উইল করে গেলে তখন উইল অনুসারে সম্পত্তি বন্টন করা হবে।

অথবা উইল না করে গেলে ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন অনুসারে সম্পত্তি ভাগ করা হবে ওয়ারিশগণের মধ্যে।

শেষ কথা

ভারতে বসবাসকারী নাগরিকরা তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা,ওয়ারিশ এবং ধর্মানুযায়ী তাদের অর্জিত স্থাবর এবং অস্থাবর সম্পত্তি বিলির ব্যবস্থা করতে পারেন। মূলত উইল করার মাধ্যমে সম্পত্তি বিভাজনে ব্যক্তির নিজস্ব ইচ্ছা বাস্তবায়ন করা হয়।

তিনি চাইলে যে কাউকে সম্পত্তি দিয়ে যেতে পারেন। উইল না থাকলে ধর্মীয় আইন অনুসারে সম্পত্তি ভাগ করা হয়। আর যদি এ দুইটির কোনটিই না অনুসরণ করা হয় তাহলে ভারতীয় উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী ওয়ারিশগণের মধ্যে সম্পত্তি ভাগ করে দেওয়া হয়।

এছাড়াও যেসব আইন, নীতিমালা এবং বিষয়গুলো অনুসরণ করা হয় তা আজকের আলোচনায় জানানোর ক্ষুদ্র প্র‍য়াস আশা করি সফল হয়েছে। সুপ্রিয় পাঠক পোস্টটি পড়ে আপনাদের মতামত জানাতে ভুলবেন না।

এরপর কোন বিষয় নিয়ে জানতে চান তা আমাদের কমেন্ট করে জানান। আমরা পরবর্তীতে সে বিষয়ে তথ্য নিয়ে হাজির হব। আজকের মত এখানেই শেষ করছি।

ধন্যবাদ সবাইকে।

Leave a Comment