সিকিম ভ্রমণ গাইড, সৌন্দর্য ও দর্শনীয় স্থান – Sikkim Travel Guide in Bangla

সিকিম ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম সৌন্দর্য। ভারতের উত্তর পূর্বে অবস্থিত সিকিমকে ঘিরে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গ, ভুটান ও তিব্বত।

পাহাড়ের প্রকৃতি, তিস্তা নদী, বিভিন্ন লেক,বরফে মোড়া এই ভ্রমণ স্থান ভ্রমণ পিপাসুদের অনেক পছন্দের। সিকিম ভারতীয় রাজ্যগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা কম জনবহুল এবং আয়তনে দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম।

Sikkim Travel Guide in Bangla
Sikkim Travel Guide in Bangla

তবু এর প্রকৃতির আকর্ষণ কোনো অংশে কম নয় বলা চলে পাহাড় প্রেমী মানুষদের স্বর্গ।পূর্ব হিমালয় অঞ্চলের একটি অংশ সিকিম, আল্পাইন এবং উপক্রান্তীয় জলবায়ু সহ এর জীব বৈচিত্র্যের জন্য উল্লেখযোগ্য।

এবং সেই সাথে সিকিমে অবস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘা ভারতের সর্বোচ্চ পর্বত শিখর এবং পৃথিবীতে তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বত শিখর।

১. ইতিহাস:

সিকিমের ইতিহাসের সূচনা প্রাচীন হিন্দু এবং তিব্বতীদের মধ্যে যোগাযোগের মাধ্যম শুরু হয়। তারপরে ১৭ শতকে বৌদ্ধ রাজ্য বা ছোগিয়াল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

সিকিম তখন ছিল ছোগিয়াল (বা ধর্মরাজ) নামে পরিচিত একজন রাজার ছত্রছায়ায় মজবুত রাষ্ট্র হয়ে উঠেছিল এবং ১৯৭৫ সালের ১৬ই মে অবধি রাজা রাজাদের দ্বারা শাসিত একটি স্বাধীন দেশ ছিল।

অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তিব্বতের সাথে বাণিজ্যপথ স্থাপনের চেষ্টা করেছিল, যার ফলে সিকিম ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অবধি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল। এরপরে গনভোটের মাধ্যমে সিকিম ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৭৫।

২. সিকিমের সৌন্দর্য ও দর্শনীয় স্থান:

সিকিমে ভারতের প্রথম রাসায়নিক মুক্ত রাজ্য হিসেবে গননা করা হয়। এখানে চাষবাসে কীটনাশক ব্যবহার করলে তার দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গননা করা হয়।

তাই সিকিমের দূষণ মুক্ত পরিবেশ, প্রকৃতির মেলবন্ধন এক আশ্চর্য সুন্দর উপলব্ধি দেয়। সিকিমের উত্তর থেকে পূর্ব পশ্চিম দক্ষিণ সমস্তটাই দর্শনীয় স্থানের মধ্যে পড়ে।

এখানকার পাহাড়,পাহাড়ী পথ, ঝর্না, জঙ্গল সবটাই উপভোগ করার মতো। চলুন জেনে নেওয়া যাক এখানকার কিছু দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে:

গ্যাংটক:

গ্যাংটক সিকিমের রাজধানী শহর এবং এই শহরের সৌন্দর্য এটিকে রাজ্যের অন্যতম প্রধান শহর হিসাবে গড়ে তোলে। অবিশ্বাস্যরূপে সুন্দর, উচ্ছ্বসিত এবং চারদিকে মেঘের মালা।

Gangtok Sikkim
Gangtok Sikkim

কাঞ্চনজঙ্ঘা ও অন্যান্য পাহাড় পর্বতের সৌন্দর্য অন্বেষণ করতে হলে অবশ্যই আপনাকে অবশ্যই গ্যাংটকের ঘুরতে যেতে হবে।

আপনি যদি মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে গ্যাংটকে আসছেন তবে পুরো শহর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা রোডোডেন্ড্রনগুলির সুগন্ধ আপনি অনুভব করতে পারবেন।গ্যাংটকে রোপিং, ট্রেকিং, হাইকিং এর সুবিধা রয়েছে।

এখানে বান ঝাকরি ফলস,রুমটেক মনেস্ট্রি,জুওলজিক্যাল পার্ক,লহাসা ফলস গ্যাংটক থেকে আরো উঁচুতে বাবা মন্দির এমন সমস্ত স্থানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

গুরুডোংমার লেক:

এই প্রশান্ত হ্রদের উজ্জ্বল ফিরোজা রঙের আভা পাশাপাশি এর চারপাশে উত্তর-পূর্বের প্রাণবন্ত সংস্কৃতি এটি সিকিমের দর্শনীয় স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম সেরা স্থান করে তুলেছে।

Gurudongmar Lake Sikkim
Gurudongmar Lake Sikkim

এই লোভনীয় হ্রদটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে 17,800 ফুট উচ্চতায় অবস্থিত।গুরুডোংমার লেকের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্যটি হ’ল এটিকে কেবল একটি ধর্মই নয় বরং তিনটি হিন্দু, শিখ এবং বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের দ্বারা মিলন স্থল হিসাবে বিবেচনা করা হয়।

বরফে ঢাকা পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় এই লেক থেকে।

ছাঙ্গু লেক:

ছাঙ্গু হ্রদটি সিকিমের রাজধানী সিকিম থেকে মাত্র 38 কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, গ্যাংটক, সিকিমের সর্বাধিক জনপ্রিয় পর্যটন স্থানগুলির মধ্যে একটি। বরফে ঢাকা এই লেকের সৌন্দর্য খুব সুন্দর।

Changu Lake Sikkim
Changu Lake Sikkim

যদি পূর্ব সিকিমে বেড়াতে সেরা জায়গাগুলি সন্ধান করছেন তবে আপনার ভ্রমণের সময় অবশ্যই এই জায়গাটি ঘুরে দেখতে হবে। পর্বতমালার মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা আপনাকে মহিমান্বিত করবে।

লাচুং, ইয়ামথাং ভ্যালি:

লাচেন বা লাচুং উত্তর সিকিমের একটি দুরের গ্রাম এবং তিব্বতী যাযাবর উপজাতিদের বসবাস এই গ্রামে।ইয়মথ্যাং হ’ল পাহাড় দ্বারা আবদ্ধ একটি সুন্দর উপত্যকা।

Lachung Sikkim
Lachung Sikkim

যেখানে গেলে আপনি মরশুমের পাহাড়ি ফুল দেখতে পাবেন। প্রচুর রঙিন ফুলে ঘেরাও একটি লেক।উত্তর সিকিমের দেখার জন্য এবং সিকিমের তুষারপাতের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য এটি সবচেয়ে বিখ্যাত একটি স্থান।

গুরুডোংমার লেক থেকে লাচুং যাওয়ার  পথটি আপনাকে অ্যাডভেঞ্চার দেবে।

জুলুক:

সিকিমের অফবিট পর্যটন স্থানগুলির মধ্যে একটি, জুলুক একটি উচ্চতর উচ্চতায় অবস্থিত একটি ছোট্ট গ্রাম এবং সিল্ক রুটের সাথে যোগাযোগের কারণে এটির একটি ইতিহাস রয়েছে।

Juluk Sikkim
Juluk Sikkim

এটি বিশেষত শীতকালে তুষারপাতযুক্ত পর্বতশ্রেণির দুর্দান্ত দৃশ্যের জন্য পরিচিতএবং সিকিমের তুষারপাতের সন্ধানকারী বা সিকিম এবং দার্জিলিংয়ের সেরা জায়গাগুলির সন্ধানকারীদের দেখার জন্য এটি একটি দুর্দান্ত জায়গা। জুলুকের পাহাড়ি পথ কুয়াশায় আচ্ছন্ন।

নাথুলা বর্ডার:

গ্যাংটকের মূল শহর থেকে প্রায় 53 কিলোমিটার দূরে নাথুলা বর্ডারের অঞ্চল টি অবস্থিত।এটি সিকিমের রাজনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন স্থান।

Nathula Sikkim
Nathula Sikkim

এই জায়গার চারপাশে ভারতীয় এবং তিব্বতীয় সংস্কৃতির সংমিশ্রণ চোখে পড়ে।একটি বিখ্যাত সীমান্ত বাজার শেরাথাং অবস্থিত।

সেখান থেকে আপনি নিজের এবং বন্ধুদের জন্য তিব্বতী জিনিসপত্র কেনাকাটা করতে পারবেন। তবে অনেক সময় নাথুলা বর্ডার এ যাওয়ার অনুমতি পাওয়া যায় না।

তিস্তা নদী:

তিস্তা নদী তার দর্শনার্থীদের জন্য আনন্দের মতো, যা তার চকচকে প্রান্তর দ্বারা প্রশান্ত এবং এটি অক্লান্তভাবে প্রবাহিত হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত যা আপনার মনকে প্রশান্ত করে তুলবে।

Tista River Sikkim
Tista River Sikkim

তিস্তা নদীর ধার ধরে প্রচুর পাথর ও ফুলের সমাবেশ তৈরি হয়েছে।কনকনে ঠাণ্ডা জলে পা ডুবিয়ে আনন্দ নিতে চান অনেক ভ্রমণ প্রেমী মানুষ।

এছাড়াও রয়েছে আরও বিশেষ কিছু স্থান যেমন নামছি,জিরো পয়েন্ট,পেলিং,রুমটেক মনেস্ট্রি,মংগং, কাঞ্চনজঙ্ঘা বেস ক্যাম্প,থাঙ্গু, হনুমান টক,বাবা হরভজং সিং এর মন্দির,গেজিং ইত্যাদি।

৩. কীভাবে যাবেন সিকিম বা গ্যাংটক:

কলকাতা থেকে সিকিমে যাওয়ার জন্য আপনাকে শিয়ালদহ থেকে নিউ জলপাইগুড়ি যাওয়ার যে কোনো ট্রেনে উঠতে হবে।

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে ওখান থেকে গাড়িতে করে সিকিম যেতে পারবেন।

এছাড়াও সিকিম ন্যাশনালাইজড ট্রান্সপোর্টের বাস চলাচল করে।সেই বাসে করেও আপনি গ্যাংটকে পৌঁছাতে পারবেন।

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে অটো করে তেনজিং নোরগে বাস টার্মিনাসের পাশে সিকিম ন্যাশনালাইজড ট্রান্সপোর্টের বাস স্ট্যান্ড।

৪. কোথায় থাকবেন:

সিকিমের মত এত জনপ্রিয় স্থানে আপনি বিভিন্ন রেঞ্জের হোটেল,লজ, হোম স্টে পেয়ে যাবেন। চেষ্টা করবেন গ্যাংটক মার্কেট এম.জি বাজারের কাছে হোটেল নেওয়ার।

৫. সিকিমে ঘুরতে যাওয়ার আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস:

  • অবশ্যই নিজের আধার কার্ড,ভোটার কার্ড সঙ্গে রাখুন কারণ সিকিমে চেক পোস্ট এ আপনার এবং আপনার পরিবারের প্রমাণ পত্র চেক করা হবে।
  • সিকিমে আবর্জনা বা থুতু ফেলা অপরাধ।এই জিনিসগুলো এড়িয়ে চলুন।
  • সিকিমের বর্ডার এলাকায় সাবধানে চলাচল করুন।মনে রাখার মতো নাথুলা বর্ডার ও জিরো পয়েন্টের মতো জায়গায় বিদেশীদের প্রবেশ নিষেধ।

Leave a Comment