রাম নবমী 2022: ইতিহাস ও তাৎপর্য | Ram Navami 2022: History and Significance

রাম নবমী 2022 (Ram Navami 2022 Date Time and Significance) 2022 রাম নবমীর ইতিহাস এবং জানুন রাম নবমী কেন পালন করা হয়? রাম নবমীর তাৎপর্য কি? ভারতীয়দের জন্য রাম নবমীর গুরুত্ব কতটা? জানুন সবকিছু এখানে।

আমাদের ভারত বর্ষ উৎসব এর দেশ। তাছাড়া বিভিন্ন রকমের উৎসবের পাশাপাশি একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হল এই রাম নবমী, যা কিনা চৈত্র মাসের নবম দিনে শুক্লপক্ষ তে হয়ে থাকে এবং ইংরেজি মাসের মার্চ ও এপ্রিলের মধ্যে। উৎসবের নাম দিয়েই জানা যায় যে রামচন্দ্রের সাথে জড়িত এই উৎসব।

রাম নবমী ইতিহাস ও তাৎপর্য - Ram Navami History and Significance
রাম নবমী ইতিহাস ও তাৎপর্য – Ram Navami History and Significance

হিন্দু ধর্ম অনুসারে ভগবান শ্রী রামচন্দ্র এই দিনটিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তাই তার ভক্তরা এই দিনটিতে রাম নবমী হিসেবে উদযাপন করে থাকেন। তাছাড়া এই উৎসবটি সমগ্র দেশে শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের সঙ্গে উদযাপন করা হয়।

কে ছিলেন এই শ্রী রামচন্দ্র?

প্রাচীন ভারতের হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অনুসারে যুগ যুগ ধরে ভগবান বিষ্ণু এই বিশ্ব সংসারকে লালন-পালন করে আসছেন। বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন রকমের অবতার এর রূপ ধারণ করে এই পৃথিবীতে অবতরণ করেছেন। বিশ্ব সংসারের সমস্ত মানুষকে সত্যের পথে নিয়ে আসার জন্য এবং মিথ্যার বিনাশ করার জন্য অবতার নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছেন।

হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অনুসারে ত্রেতা যুগে রাবণের অত্যাচার এবং ধর্ম পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ভগবান বিষ্ণু শ্রী রামচন্দ্র এর অবতার রূপ ধারণ করেছিলেন। সম্পূর্ণ সৃষ্টি তার রঙে রাঙিয়ে গেছে, সন্ত্রাস এর অবসান ঘটাতে শ্রী রামচন্দ্র আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। তাকে আর এক নামেও জানা যায় সেটা হল রঘুকুল নন্দন।

রাম নবমীর ইতিহাস:

হিন্দু ধর্মের একটি মহান এবং ধর্মীয় মহাকাব্য হলো রামায়ণ যা অযোধ্যার রাজা দশরথ এবং তার পুত্র শ্রীরাম চন্দ্রের সমস্ত ঘটনা কে বর্ণনা করে। পূরাণের কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, রাজা দশরথের তিনটি রানী ছিল তবে তিনি তিন নারীর কাছে থেকে কোনো রকম সন্তান সুখ পাননি।

ঋষিদের কাছে এই বিষয়ে অনেক পরামর্শ করার পর রাজা দশরথকে পুত্রেষ্টিযোগ্য করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেই মত রাজা যজ্ঞ করান এবং সেই যজ্ঞ  থেকে যে ক্ষীর প্রাপ্ত হয় সেই ক্ষীর রাজা তার তিন রানী দের মধ্যে প্রিয় রানী কৌশল্যা কে দিয়েছিলেন।

যেহেতু তিন রানীর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল, তাই কৌশল্যা সেই ক্ষীরের অর্ধেকটা কৈকেয়ী কে দিয়েছিলেন এই কারণে কৌশল্যার গর্ভে রামচন্দ্র এবং কৈকেয়ীর গর্ভে ভরত এবং সুমিত্রার দুই ভাগ অর্থাৎ কৌশল্যা ও কৈকেয়ীর দেওয়া দুটি ভাগ ক্ষীর খাওয়ার ফলে যমজ সন্তান লক্ষণ ও শত্রুঘ্ন জন্মগ্রহণ করেন।

রামচন্দ্র চৈত্র মাসের নবম দিনে শুক্ল পক্ষ তে জন্মগ্রহণ করেন, অযোধ্যার বাসিন্দারা তাদের নতুন রাজার সাথে খুব খুশি হয়েছিল। তাই তারা প্রতিবছর রামনবমী হিসেবে তাদের রাজার জন্মদিন উদযাপন শুরু করে, যা সম্পূর্ণ ভারতবর্ষের একটা ঐতিহ্য উৎসব হিসাবে আজও পরিচিত।

রামনবমী উৎসবের গুরুত্ব: 

প্রতিটি হিন্দু উৎসবের নিজস্ব আলাদা আলাদা তাৎপর্য রয়েছে। তেমনি রামনবমী ও হিন্দুদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎসব যা চৈত্র মাসে পালন করা হয়। অশুভ শক্তির বিনাশ এবং ঐশ্বরিক শক্তির আগমনের জন্য রাম নবমী উৎসব পালন করা হয় বলে মনে করা হয়। রামনবমী সমস্ত হিন্দুদের জন্য একটি বিশেষ উৎসব যা সম্পূর্ণ উৎসাহ ও ভক্তির সাথে পালন করা হয়।

কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, ভগবান রামচন্দ্র একটি বিশেষ কাজ বা দায়িত্ব পালন করার জন্য পৃথিবীতে এসেছিলেন অর্থাৎ অসুর রাজা রাবণের বধ করে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

রাম নবমী উৎসবের তাৎপর্য: 

রামনবমীর এই দিনটি নবরাত্রীর শেষ দিন সুতরাং দুটি প্রধান হিন্দু উৎসব একসাথে, এই উৎসবটির গুরুত্ব আরো বেশি বাড়িয়ে তোলে। রামনবমীর উপবাস করলে পাপের ক্ষয় হয় এবং শুভ ফল দেয় বলে মনে করা হয়।

রাম নবমী উপলক্ষে আবৃত্তি, ভজন, কীর্তন এর আয়োজন করা হয়। দেশের প্রতিটি প্রান্তে উৎসবের আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। এই দিন বেশিরভাগ মানুষ উপবাস করে থাকেন এবং নদীতে স্নান করে সমস্ত ভক্তরা রামের আশীর্বাদ গ্রহণ করেন।

রামচন্দ্রের ত্যাগ মানুষকে অনেক বেশি শান্ত করতে সাহায্য করে। কেননা তিনি রাজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করার পরেও রাজবাড়ীর সমস্ত আরাম, আয়েশ ছেড়ে দিয়ে বনের জীবনকে মেনে নিয়েছিলেন, শুধুমাত্র পিতার আদেশে। সেই কারণে রামচন্দ্রের আশীর্বাদ গ্রহণ করার জন্য তার জন্মতিথিতে প্রতিবছর রাম নবমী উৎসব পালন করা হয়।

এই উৎসবটি পালন করার পদ্ধতি বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। বিশেষ করে অযোধ্যা ও বানারসে গঙ্গা ও সরায়ু নদীতে স্নান করে এবং ভগবান রাম, সীতাহনুমানের রথযাত্রা আয়োজন করা হয়। একইভাবে সিতামণি, অযোধ্যা, বিহার এই সমস্ত জায়গায় বিভিন্ন অনুষ্ঠান এর আয়োজন করা হয় আনন্দ উৎসব উপভোগ করার জন্য।

অনেক জায়গায় প্যান্ডেল করে সেখানে ভগবান রামের প্রতিমা স্থাপন করা হয়। ঘরে ঘরে ক্ষীর, পুলি, হালুয়া, রান্না করা হয়। অনেক জায়গায় রামায়ণ এবং গান হয়, রামায়ণ পাঠ করা হয়, রথযাত্রা বের হয়, মেলার আয়োজন করা হয়, এইভাবে বিভিন্ন জায়গায় আলাদা আলাদা পদ্ধতিতে উদযাপন করা হয় রামনবমী উৎসব। যা কিনা রামচন্দ্রের জন্মদিন পালন করার সাথে সাথে আনন্দ উৎসবের শুরুটাও হয়ে যায়।

ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বহু রাম মন্দিরে রঙিন ফুল এবং আলোকসজ্জার সঙ্গে এই রামনবমী উৎসবটির আয়োজন করা হয়। পবিত্র নদীতে স্নান করে পারেণ্যের সাথে ঈশ্বরের নাম জপ করে মন্ত্র উচ্চারণ করেন। শ্রী রামচন্দ্রের আশীর্বাদ পাওয়ার জন্য অনেক হিন্দু ভক্ত রামনবমী উপলক্ষে উপবাস ও রাখেন।

রামচন্দ্রের জন্মের উদ্দেশ্য সমাজে অধর্মকে ধ্বংস করে ধর্মের প্রতিষ্ঠা করা। তেমনি রামচন্দ্রের ত্যাগ, ধৈর্য এবং সহ্য শক্তি মানুষকে অনুপ্রাণিত করে জীবনে চলার পথে। সেই কারণে এই রামনবমী উৎসব শ্রী রামচন্দ্রের জন্মদিন পালনের সাথে সাথে তার আশীর্বাদ প্রাপ্ত করার জন্য নিষ্ঠা ভরে পূজা, ব্রত ও উপবাস রাখা হয়।

তাছাড়া এই দিনে সমস্ত রাম মন্দির সেজে ওঠে ফুল আর আলোক সজ্জায়। স্থানীয় জায়গাতে মেলা, রামায়ণ পাঠ, গান ইত্যাদি চলে বেশ কয়েক দিন ধরে। যেটা স্থানীয় মানুষদের কাছে এই রামনবমী উৎসবকে অনেক বেশি আনন্দমুখর করে তোলে।

চৈত্র মাসে বিভিন্ন ধরনের উৎসব লেগেই রয়েছে। তার মধ্যে এই রামনবমী উৎসব একেবারে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হিসেবে পরিচিত। ফুল, ফল, নৈবেদ্য অর্পণ করে দেশের বিভিন্ন কোণ ফুল ও আলোকসজ্জায় সেজে ওঠে। যেন সমস্ত দেশ এর সাথে সাথে প্রকৃতিও সেজে ওঠে বিভিন্ন রঙে।

রামনবমী উৎসব উপলক্ষে আনন্দ অনুষ্ঠান চলে অনেকদিন যা ছোট থেকে বড় সকলের কাছে রামনবমী উৎসবকে আরো বেশী গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে, তাই সারা বছর ধরে এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে থাকেন বহু মানুষ।

Leave a Comment