ওনাম উৎসব 2023: ইতিহাস ও তাৎপর্য | Onam 2023: History and Significance

ওনাম উৎসব 2022 (Onam 2022 Date Time and Significance) 2022 ওনাম উৎসব ইতিহাস এবং জানুন ওনাম উৎসব কেন পালন করা হয়? ওনাম উৎসব তাৎপর্য কি? ভারতীয়দের জন্য ওনাম উৎসব গুরুত্ব কতটা? জানুন সবকিছু এখানে।

ভারত হল উৎসব প্রবন একটি দেশ। এখানে প্রতিনিয়ত কোন না কোন উৎসবের আমেজ লেগেই রয়েছে। এই সমস্ত উৎসবের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হল ওনাম উৎসব। খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মাবলম্বী দের সাথে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের শান্তি ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান কেরালার একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব হলো এই ওনাম উৎসব।

ওনাম উৎসব ইতিহাস ও তাৎপর্য - Onam History and Significance
ওনাম উৎসব ইতিহাস ও তাৎপর্য – Onam History and Significance

কেরালার সবচেয়ে বড় এবং সকলের কাছে খুবই জনপ্রিয় একটি উৎসব হলো এটি এই উৎসব সার্বজনীন এবং ধর্মনিরপেক্ষ। প্রতি বছর আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ১০ দিন ধরে চলে এই ওনাম উৎসব। এই দশদিন বিভিন্ন রকমের আচার, অনুষ্ঠান ও আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে থাকে এই উৎসবটি। উৎসবের প্রথম এবং শেষ দিন বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।

ওনাম উৎসবের ইতিহাস: 

পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী প্রাচীনকালে এক অসুরাজ কেরালায় রাজত্ব করতেন তখন কেরালার স্বর্ণযুগ অসুর হয়েও রাজ্যের সকল প্রজার প্রতি ছিল তার উদার মনোভাব। রাজ্য তে ছিল না কোন অভাব, ছিল না কোন ঐশ্বর্যের খামতি। তাই সেই কারণে রাজ্যের সকলের ছিলেন খুবই সুখী। সেই সাথে মহাবলীও ছিলেন তেজস্বী। তার দাপটে দেবতারা সর্বদা থাকতেন তটস্থ।

দেবতাদের আসন তখন নড়ে গিয়েছিল। ফলে দেবতারা ভগবান বিষ্ণুর শরণাপন্ন হলেন অসুর রাজকে দমন করার জন্য ভগবান বিষ্ণু বামুন অবতার রূপে কেরালায় অবতীর্ণ হন। মহাবলী যেমন বীর ছিলেন তেমনি দানশীলও। সাহায্য প্রার্থী কাউকেই তিনি ফিরিয়ে দিতেন না।

এই সুযোগটি নিলেন বিষ্ণু। তিনি সাহায্য প্রার্থী হয়ে মহাবলীর কাছে উপস্থিত হলেন। বামুনদেব মহাবলীর কাছে বসবাসের জন্য তিনটি পদক্ষেপ মাপের জমি চাইলেন অর্থাৎ ৩ পা হেঁটে গেলে যতটা জমি হয় ততটাই জমি চাইলেন। বিষ্ণু কে চিনতে পারলেন না, তাই বামনের প্রার্থনা তিনি মেনে নিলেন।

প্রথমবার পা রাখলেন বিষ্ণু গোটা পৃথিবী অতিক্রম করে, তারপর দ্বিতীয় পা রাখলেন স্বর্গ ও পাতাল, তৃতীয়বার পা তুলে মহাবলী কে প্রশ্ন করেন “কই আরেকটি পা রাখবো কোথায় ? স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল যে সব শেষ।” এমন দেখে মহাবলীর সবই বুঝতে পারলেন। তিনি তখন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে পড়েছেন, কিছুই করার নেই, তখন তিনি তার নিজের মাথা নিচু করে মহাবলী বামন দেবকে তার মাথায় পা রাখতে বললেন।

বামুন তখন মহাবলীর মাথায় পা রেখে এত জোরে চাপ দেন যে, মহাবলী মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়েন। বিষ্ণুর কাছে অনুরোধ জানালেন তিনি যেন তার প্রিয় রাজ্যে প্রতি বছর একবার এসে তার প্রিয় প্রজা দের দেখে যেতে পারেন।

বিষ্ণু মহাবলির এই অনুরোধ মেনে নেন। বামন দেবের আশীর্বাদে পৃথিবীর অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন মহাবলী। ধারণা করা হয় ওনাম উৎসবের মাধ্যমে অসুর রাজ মহাবলী তার প্রিয় কেরালায় ফিরে আসেন, তার আগমন উপলক্ষে পালিত হয়ে থাকে এই ওনাম উৎসবটি।

ওনাম উৎসবের সাথে জড়িয়ে আছে হিন্দু পুরাণের একটি কাহিনী। এর পেছনে কারণ রয়েছে, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সাথে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের শান্তি ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহাবস্থান কেরালার একটি ঐতিহাসিক সত্য। সমাজ, জীবন, পোশাক-আশাক এবং শিক্ষা সংস্কৃতির জগতে কেরালার হিন্দু, খ্রিষ্টান এবং মুসলিম সম্প্রদায় ভুক্ত মানুষদের মধ্যে কোন রকম পার্থক্য নেই।

কেরালার সবচেয়ে জনপ্রিয় সাহিত্যিক মোহাম্মদ বসির, কমলা সুরাইয়া এবং জনপ্রিয় চিত্রা অভিনেতা মামুটটি ছিলেন মুসলমান। এক সময়ে জনপ্রিয় গায়ক যীশু দাস ছিলেন খ্রিস্টান, এমনকি হিন্দু ধর্মের ঐতিহ্যমন্ডিত বিখ্যাত কথাকলির নৃত্যের আবহও সংগীতের নাম করা একজন জনপ্রিয় গায়কের নাম ছিল হায়দার আলী। শুধুমাত্র তাই নয়, সামাজিক অনাচার এবং কু – প্রথার বিরুদ্ধে সব সম্প্রদায়ের যুবকরা সমানভাবে উৎসাহী।

বহু বছরের অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক কেরালার জনগণ তাই এই ওনাম উৎসব কে নিজেদের জীবনের সাথে যুক্ত করে নিয়েছে। সব ধর্মের মানুষের একটি মিলন মেলা বলা যেতে পারে এই ওনাম উৎসব। রাজ্যের সমস্ত ধর্মের, সমস্ত জাতের মানুষ একত্রিত হন এই উৎসবে এবং আনন্দ উপভোগ করে থাকেন।

সর্ব ধর্মের মিলন উৎসব ও নাম উৎসব:

কেরলের সব থেকে জনপ্রিয় ওনাম উৎসব সর্ব ধর্মের মানুষের জন্য অনুষ্ঠিত একটি উৎসব। রাজ্যের সমস্ত ধর্মের, সমস্ত জাতের মানুষ এই উৎসবে শামিল হয়ে থাকেন। হিন্দু-মুসলমান, খ্রিস্টান সবার কাছে এই উৎসব সমান বার্তা বয়ে নিয়ে আসে। জাতীয় ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই এই উৎসবে গা ভাসিয়ে আনন্দ উপভোগ করে থাকেন।

তো চলুন তাহলে এই ওনাম উৎসবের দশ দিন ব্যাপী উৎসব সম্পর্কে জানা যাক:

প্রথম দিন, আত্তম:

ওনাম উৎসবের দশ দিন আগে হল আত্তম নক্ষত্র। সকালে স্থানীয় মন্দিরে দেবতার কাছে প্রসাদ নিবেদন করে এই উৎসবের আয়োজন শুরু হয়। সেদিন প্রত্যেকটি বাড়ির উঠোনে নানা ধরনের, নানা রঙের ফুলের একটি বৃত্ত একে অর্থাৎ সেখানে ফুলের রংগোলি অথবা আলপনা করা হয়। তার মধ্যে দিয়ে এই উৎসবের সূচনা হয়ে থাকে। এই আলপনা কে বলা হয় পোক্কালম। প্রতিদিন এই বৃত্তের সংখ্যা বাড়ে একটি করে, অর্থাৎ ওনাম দিনের সকালে বৃত্তের সংখ্যা দিয়ে দাঁড়ায় দশটি।

দ্বিতীয় দিন, চিথিরা:

ওনাম উৎসবের দ্বিতীয় দিন, সকলে তাদের বাড়িঘর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখেন। তারপর স্থানীয়রা উৎসব অনুষ্ঠানের ঘরবাড়িতে রং করে, আলোকসজ্জা দিয়ে বাড়ির চারপাশ সাজিয়ে তোলেন। বাড়ির সদর দরজাতে আলপনা এঁকে থাকেন বাড়ির মহিলারা।

তৃতীয় দিন, চোধি:

এই দিনটি কেনাকাটার দিন বলা যেতে পারে। প্রত্যেকেই তাদের নিজেদের সাধ্যমত পরিবারের জন্য এবং আত্মীয়-স্বজনদের জন্য উপহার সামগ্রী এবং পোশাক আশাক কিনে থাকেন।

চতুর্থ দিন, ভিসাকাম:

উৎসবের এই দিন দুপুরে আয়োজন করা হয় মধ্যাহ্ন ভোজনের এবং সেটা মহাভোজন হিসাবে ও পরিচিত। স্থানীয় মালায়ালাম ভাষায় তাকে বলা হয় সাদ্য।  এটি কেরালার প্রতিটি বাড়িতেই বানানো হয়ে থাকে। একেবারে যাকে বলে পঞ্চ ব্যঞ্জন সহকারে রান্না বান্না।

তিন রকম কলা ভাজা, পাপড়, থোরান, মেজহুক্কুপুরাত্তি, ওলান, কালান, আবিয়াল, সাম্বার, ভাত, ডাল, চার রকম আচার, ২-৩ টি পদের পায়েস, তার সাথে ২৬ রকমের বেশি রান্নার পদ থাকে এই খাবারে তালিকা তে।

পঞ্চম দিন, আনিঝাম:

ওনামের এই উৎসবের এই পঞ্চম দিনে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা হয়ে থাকে। যে হ্রদে লবণ রয়েছে, সেই হ্রদ যাকে ব্যাক ওয়াটার বলা হয়ে থাকে, সেইসব এলাকায় এই নৌকা বাইচের আদর্শ স্থান।

উৎসবের পঞ্চম দিন সারা রাজ্য জুড়ে আয়োজিত হয়ে থাকে নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতাতে ৪০ থেকে ৫০ টি পর্যন্ত নৌকা থাকে। যা দেখার জন্য হ্রদ এবং নদীর ধারে লোকজনের ভিড় একেবারে উপচে পড়ে।

ষষ্ঠ দিন, থিরিকেটা:

উৎসবের এই ষষ্ঠ দিনে ফুলের যে আলপনা, তার আকার বাড়তে থাকে। অনেকেই এই দিনটিতে প্রিয়জন, আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যান। আবার অনেকেই আবার পূর্বপুরুষদের শ্রদ্ধা জানাতে তাদের ভিটেমাটি থেকে ঘুরে আসেন।

যারা বিদেশে থাকেন অথবা অন্য কোথাও ঘর বেধেছেন তারা আগের বাড়িতে বা গ্রামের বাড়িতে এসে সময় কাটান।

সপ্তম দিন, মুলাম:

উৎসবের সপ্তম দিনে উৎসব যেন আরও জাঁকজমকপূর্ণ হয়ে ওঠে। পরিবারের আরো সমস্ত আত্মীয়-স্বজন মিলে এই উৎসবে মেতে ওঠেন। বিভিন্ন মন্দির গুলিতে বিশেষ প্রসাদ এর আয়োজন করা হয়।

বাড়িতে উৎসবের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মেয়েরা কেরালার বিখ্যাত লোকো নৃত্য কায়কোট্টইকলি এর আয়োজন করে থাকেন। এছাড়াও পুলিকলি, থুম্বি, থুনলাল ও কথাকলির মত নৃত্যকলাও পরিবেশন করা হয়।

অষ্টম দিন, পুরাদম:

ধীরে ধীরে এই উৎসবের দিন শেষ হতে চলেছে। অষ্টম দিনের মহাবলী ও বামন দেবতার ছোট মূর্তি এনে ফুলের আলপনার মাঝখানে স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে দিয়ে মহাবলী কে রাজ্যবাসী তাদের বাড়িতে আনুষ্ঠানিক ভাবে আমন্ত্রণ জানিয়ে থাকেন।

নবম দিন, উথরাদম:

এই দিনটি পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী উৎসবের শেষ চারদিন, রাজা মহাবলী রাজ্য ভ্রমণে বের হয়ে প্রজাদের আশীর্বাদ করেন, তাই উৎসবের শেষ দিনগুলো শুভ দিন হিসেবে মনে করা হয়।

দশম দিন, থীরুভুনাম:

ওনাম উৎসবের শেষ দিন হল থিরুভুনাম। সকালে সবাই স্নান সেরে নতুন কাপড় পরে ঘরবাড়িতে নতুন করে আলপনা দেওয়া শুরু করে দেন।

তারপরে এই দিনটি সরকারিভাবে সারা রাজ্যে আলোকসজ্জা ও আতশবাজির ব্যবস্থা করে থাকে। শহরজুড়ে বের হয় শোভাযাত্রা, এইসব শোভাযাত্রায় থাকে কেরালার ঐতিহ্যবাহী সংগীত এবং নৃত্য।

ওনাম উৎসবে প্রথা মেনে পোশাক পরা:

কেরলে ওনামের সময়ে প্রথা অনুসারে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরতে হয়। মহিলারা সোনালী পাড় দেওয়া সাদা শাড়ি পড়েন আর পুরুষেরা লুঙ্গির মতো করে সাদা অথবা ঘিয়ে রঙের ধুতি পরেন। যাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় মুন্ডু আর ওপরে জামা অথবা কুর্তা পরে থাকেন।

এই উৎসবের বিভিন্ন খেলা:

এই উৎসব যেহেতু দশ দিন ধরে চলে তাই আনন্দের সীমা থাকে না। কেরলে ওনামের সময়ে কায়ান কলি, আত্তাকালাম, আম্বায়াল, কুটুকুটু, তালাপ্পনথুকলি, এই সমস্ত নামের অনেকগুলি খেলা চালু হয়ে যায়।

তবে এই খেলা গুলি বেশ কষ্টের এবং আঘাত লাগার ভয় রয়েছে বলে আজকাল অনেকেই বিশেষ করে শহরাঞ্চলে অনেকেই খেলতে চান না। তবে গ্রামাঞ্চলে অনেকেই এই খেলায় উৎসাহিত রয়েছেন, তারা প্রথা মেনে এই খেলাতে এগিয়ে আসেন।

ফুল দিয়ে আলপনা:

বিভিন্ন রঙের বিভিন্ন রকমের ফুল দিয়ে অসুররাজ মহাবলী কে অভ্যর্থনা জানাতে কেরলে ওনামের দিন প্রতিটি বাড়ির দরজায় ফুল দিয়ে আলপনা দেওয়া হয়। আজকাল আবার অনেক জায়গায় বিশেষ করে স্কুল, কলেজ, অফিসে ওনামের সময় ফুল দিয়ে আলপনার প্রতিযোগিতাও রাখা হয়।

এদিয়ে বোঝা যায় যে, সর্বধর্ম নির্মিশেষে কেরলে ওনাম উৎসব খুবই জাঁকজমকপূর্ণ একটি উৎসব। যেখানে সবাই জাতি, ধর্ম ভুলে মনুষ্যত্বের ধর্মে মেতে ওঠেন। আর এই উৎসব উদযাপন ১০ দিন ধরে হওয়ার কারণে, বাচ্চা থেকে বড় সকলেই খুবই উৎসাহ ও আনন্দের সাথে কাটিয়ে থাকেন।

Leave a Comment