গণেশ চতুর্থী 2023: ইতিহাস ও তাৎপর্য | Ganesh Chaturthi 2023: History and Significance

গণেশ চতুর্থী 2022 (Ganesh Chaturthi 2022 Date Time and Significance) 2022 গণেশ চতুর্থী ইতিহাস এবং জানুন গণেশ চতুর্থী কেন পালন করা হয়? গণেশ চতুর্থী তাৎপর্য কি? ভারতীয়দের জন্য গণেশ চতুর্থী গুরুত্ব কতটা? জানুন সবকিছু এখানে।

গণেশ হলেন সিদ্ধিদাতা, গণেশ চতুর্থী অথবা গণেশ উৎসব হলো হিন্দু দেবতা গণেশের বাৎসরিক পূজা উৎসব। শিব এবং পার্বতীর পুত্র গজানন অর্থাৎ গনেশ হিন্দুদের বুদ্ধি, সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের দেবতা হিসেবে পরিচিত।

গণেশ চতুর্থী ইতিহাস ও তাৎপর্য - Ganesh Chaturthi History and Significance
গণেশ চতুর্থী ইতিহাস ও তাৎপর্য – Ganesh Chaturthi History and Significance

হিন্দুরা বিশ্বাস করেন যে, এই দিন গণেশ তার ভক্তদের মনের সমস্ত ইচ্ছা পূরণ করতে মর্ত্যে অবতীর্ণ হন। এছাড়া সংস্কৃত, তেলেগু, তামিল, ভাষাতে এই উৎসবকে বিনায়ক চতুর্থী অথবা বিনায়ক চবিথি  নামেও অনেকেই জানবেন।

সিদ্ধিদাতা গণেশের জন্মোৎসব রূপে পালিত হয়ে আসছে এই উৎসব, হিন্দু পঞ্জিকা অনুযায়ী ভাদ্র মাসের শুক্লা চতুর্থী তিথিতে গণেশের এই পুজো অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত এই দিনটি আগস্টের কুড়ি তারিখ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পড়ে থাকে, আর দশ দিন ধরে এই উৎসব চলে খুবই সমারোহে।

গনেশ পূজা ভারতের কোন কোন জায়গায় পালিত হয়ে থাকে?

গণেশ পূজা ভারতের সর্বত্রই অনুষ্ঠিত হলেও, এই উৎসবটি বিশেষ করে কর্ণাটক, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র অথবা মুম্বাই, মধ্যপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, গুজরাট, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা ও ছত্রিশগড় রাজ্যে খুবই ধুমধাম করে পালন করা হয়। তাছাড়া শ্রীলঙ্কা তে তামিল হিন্দুরাও এই গণেশ উৎসব ধুমধাম ভাবে পালন করে থাকেন।

কথিত আছে যে, সমস্ত শুভ কাজের শুরু হয় শ্রী গনেশের নাম নিয়ে। আর তাই সমস্ত কাজের সফলতাও আসে। গণেশ পূজা বাদ দিয়ে কোন পূজাই সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। দেবতাদের মধ্যে তাকেই প্রথম পুজ্য বলে গণ্য করা হয়।

এছাড়া গণেশের প্রায় ১০৮ টি নাম আছে, এর মধ্যে গজানন, গণপতি, বিনায়ক এবং বিঘ্নরাজ, এই নামগুলি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার পাশাপাশি গণেশ হলেন সমৃদ্ধির প্রতীক, তাই তার আরেক নাম হলো সিদ্ধিদাতা গণেশ।

গণেশ চতুর্থীর ইতিহাস সম্পর্কে জানা যাক: 

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, দেবী পার্বতী গণেশের সৃষ্টি করেছিলেন এবং তাকে পার্বতীর দরজা পাহারা দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। শিব ফিরে এসে পার্বতীর ঘরে ঢুকতে গেলে গণেশ তাকে বাধা প্রদান করেন।

একটি ছোট্ট ছেলের এত আস্পর্ধা দেখে মহাদেব রেগে যান। যুদ্ধ শুরু হয়, কেননা মায়ের রক্ষা করার জন্য তিনি এমনটা করেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ চলাকালীন মহাদেব রাগের মাথায় গণেশের মাথা কেটে ফেলেন।

গণেশ এর মুণ্ডহীন দেহ দেখে পার্বতী প্রচন্ড কান্নাকাটি করতে থাকেন, তার সন্তানকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য তিনি মহাদেবের কাছে অনুরোধ করেন। তখন অন্য দেবতাদের নির্দেশ দেন উত্তর দিকে গিয়ে যার মাথা আগে দেখতে পাবে সেই মাথাই কেটে নিয়ে আসতে।

দেবতারা প্রথমে একটি হাতি পেয়ে তার মাথা নিয়ে আসে, সেই মাথাটিই গণেশের দেহে বসিয়ে দেন শিব। আর সেখান থেকেই গণেশের মাথা হাতির মাথার মতো দেখতে হয়েছে। আর এই ভাবেই মর্ত্যে তার পূজার প্রচলন শুরু হয়।

গণেশ চতুর্থীর দিন পুজোর জন্য বিশেষ নৈবেদ্য অথবা খাবার: 

কোনো পুজোতে, কোনো দেবদেবী যে জিনিসটা খেতে পছন্দ করেন, সেটাই বেশি করে নিবেদন করাটা পূজার রীতির মধ্যে পড়ে। তেমনি গণেশ যে সমস্ত খাবারগুলি খেতে পছন্দ করেন সেগুলি কমবেশি সকলেরই জানা, তবে বিশেষ করে লাড্ডু আর মোদক তার অত্যন্ত প্রিয় খাবারের মধ্যে পড়ে।

মোদক হলো চালের গুঁড়ো দিয়ে নারকেলের পুর দিয়ে তৈরি বিশেষ একটি মিষ্টি। গণেশ পূজার ঠিক আগে মিষ্টির দোকানে এই মোদকের নানান বৈচিত্র দেখতে পাওয়া যায়। দশ দিন ধরে চলা এই গণেশ চতুর্থীর উৎসবে মোদকের রমরমা প্রায়ই চোখে পড়ে।

গণেশ চতুর্থী দেশের বিভিন্ন জায়গায় পালিত হয় দুই দিন ধরে, কিন্তু মহারাষ্ট্র ও দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় টানা ১০ দিন ধরে এই উৎসবটি মহাসমারোহে পালিত হয়ে আসতে অনেক দিন আগে থেকে।

গণেশ চতুর্থীর শেষ দিনকে বলা হয় অনন্ত চতুর্দশী আর ১১ তম দিনে গণেশ কে ভাসানো হয়ে থাকে গঙ্গায় অথবা এখন অনেকে বড় বড় জলের ট্রাঙ্ক তৈরি করে সেখানে গণেশের মূর্তি ভাসিয়ে থাকেন।

গণেশ পূজার জন্য প্রয়োজনীয় যে উপকরণ গুলি লাগবে:

  • প্রথমত গণেশের মূর্তি অথবা কোন ছবির পট
  • পৈতে
  • নতুন ধুতি
  • জলের পাত্র
  • লাল চেলী
  • পঞ্চমৃত
  • অক্ষত
  • এলাচ
  • নারকেল
  • সুপারি
  • ঘি
  • কর্পূর
  • গঙ্গাজল
  • চৌকি
  • মিষ্টির মধ্যে লাড্ডু / মোদক
  • লাল ফুল এবং
  • দুর্বা ঘাস।

গণেশ চতুর্থী পূজা করার বিধি:

  • এই দিনে তাড়াতাড়ি উঠে স্নান সেরে বাড়ির মন্দির পরিষ্কার করে ফেলুন।
  • এরপর ভগবান গণেশের মূর্তি বা পটে নতুন ধুতি ও পৈতে জড়িয়ে, চৌকিতে লাল চেলি পেতে আসনে বসান।
  • প্রথমত নির্জলা উপবাস করে পূজায় বসতে হয়।
  • নিয়ম অনুযায়ী দুপুরে শুরু হয় সিদ্ধিদাতার আরাধনা, কারণ শাস্ত্র মতে  বলা হয়েছে যে, ভরা মধ্যাহ্নে জন্মগ্রহণ করেছিলেন গৌরী পুত্র গণেশ।
  • মন্ত্র জপ করে ষোড়শ উপাচারে সিদ্ধি বিনায়কের পূজা করতে হয়।
  • পুজা শুরুর ক্ষেত্রে  ঘি এর প্রদ্বীপ জ্বালিয়ে সংকল্প করতে হয়।
  • তারপরে মন্ত্র জপ করে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করতে হয়, মূর্তি স্নান এবং দেবতাকে ভোগ উৎসর্গ করতে হয়।
  • দুর্বা ঘাস, ফুল দিয়ে সাজিয়ে লাড্ডু অথবা মোদক দিতে হবে ভোগে।
  • এরপর যাবতীয় নৈবেদ্য সাজিয়ে দিন। কর্পূর এবং ধুপ দেখিয়ে আরতি করুন, ভোগ দেওয়ার আগে গঙ্গা জল ছিটিয়ে পরিস্কার করে নেবেন সেই জায়গাটি।
  • আর হ্যাঁ, সব থেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, গণেশ পূজায় কখনোই কিন্তু তুলসী পাতার ব্যবহার করবেন না।

গণেশ চতুর্থীর তাৎপর্য: 

গণেশ চতুর্থীর তাৎপর্য রয়েছে প্রচুর পরিমাণে, নিয়ম মেনে গণপতি বাপ্পার অথবা সিদ্ধিদাতা গণেশের পূজা করলে বিভিন্ন রকমের সুফল পাওয়া যায়। তো চলুন জেনে নেওয়া যাক, গণেশ চতুর্থীর দিন গণেশ পূজা করলে আপনি কোন কোন সুফল পেতে পারেন:-

  • ব্যবসায় অগ্রগতি: অর্থাৎ আপনি যদি ব্যবসায়ী হয়ে থাকেন তাহলে ব্যবসায় উন্নতি করার জন্য আপনি গণেশ চতুর্থী এর দিন গণেশ পূজা করতে পারেন নিষ্ঠা ভরে। ব্যবসা কে সঠিক পথে চালিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য গণপতি বাপ্পা আপনাকে ব্যবসাতে লাভের মুখ দেখাবেন।
  • দারিদ্রতা থেকে মুক্তি লাভ: পৃথিবীতে টাকার গুরুত্ব কতটুকু সেটা আমরা সকলেই জানি। দারিদ্রতা আমাদের জীবনের চরমতম অভিশাপ বলা যায়। এর থেকে বাঁচার জন্য অনেকেই অনেক রকম পন্থা অবলম্বন করেন। তবে আপনি যদি গণেশ চতুর্থীর দিন গণেশ পূজা করে থাকেন, তাহলে জীবনের অনেক উন্নতি সাধন করতে পারবেন।
  • চাকরিতে উন্নতি সাধন: অনেকেই সরকারি চাকরি করতে পছন্দ করেন, ব্যবসা অনেকটাই পছন্দ করেন না। তবে চাকরিতে পদোন্নতি বলে যে বিষয়টি রয়েছে সেক্ষেত্রেও আপনি অনেকটাই লাভবান হতে পারেন, সিদ্ধিদাতার আরাধনা করার মাধ্যমে।
  • শ্রীবৃদ্ধি এবং ধন-সম্পদ বৃদ্ধি: যদি সঠিক নিয়ম মেনে গণেশ পূজার দিন গণেশ পূজা করা যায়, তাহলে জীবনে শ্রী বৃদ্ধি এবং সংসারের ধন-সম্পদ বৃদ্ধি ঘটে, যা আপনি নিজে থেকেই বুঝতে পারবেন।
  • রোগ ব্যাধি থেকে মুক্তি: স্বাস্থ্যই সম্পদ, সেই কারণে প্রতিটি মানুষ চান যে, সবসময় সুস্থ থাকার জন্য। তার জন্য আপনি সিদ্ধিদাতা গণেশের কাছে সুস্বাস্থ্য কামনা করে পূজা করতে পারেন।
  • এছাড়া বলা যায় যে, কোন মানুষের দীর্ঘায়ু কামনা করা থেকে শুরু করে বিদ্যায় উন্নতি, ছাত্র-ছাত্রীদের বিদ্যার জন্য, ভালো রেজাল্ট করার জন্য আপনি গণেশ চতুর্থীর দিন গণেশ পূজা করতে পারেন।
  • বিবাহিত জীবন সুখের হওয়ার জন্য গণেশ চতুর্থীর দিন গণেশ পূজা করুন। সমস্ত রকম মামলা থেকে আপনি জয়ী লাভ হতে পারেন।
  • একটি সুন্দর সুখী পরিবার তৈরি করার জন্য গণেশ চতুর্থীর দিন গণেশ পূজা আপনাকে অনেকখানি শান্তি প্রদান করবে।

জীবনে অনেক সমস্যা থাকে সমস্ত রকম সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে পারেন এবং যা বাধা-বিপত্তি আছে সেগুলি নাশ করেন সিদ্ধিদাতা গণেশ। ব্যক্তিগত এবং পেশাগত জীবনের নানা রকম সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে ভক্তরা গণেশ চতুর্থী পূজা পালন করে থাকেন।

আমাদের বাংলায় যেমন দুর্গাপূজা বেশ কিছুদিন ধরে ধুমধাম ভাবে অনুষ্ঠিত হয় এবং চারিদিকে জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশ পরিলক্ষিত হয়, তেমনি কিন্তু মুম্বাইতে এই গণেশ চতুর্থী অর্থাৎ গনেশ পূজা দশ দিনব্যাপী এতটাই ধুমধাম ভাবে অনুষ্ঠিত হয় যে, সেটা আমাদের বাংলায় দুর্গাপুজোর সাথে তুলনা করা যেতেই পারে। কত বড় বড় গণেশের মূর্তি এবং বড় বড় মণ্ডপে পূজা, সমস্তই মহারাষ্ট্র অথবা মুম্বাইবাসী ভীষণভাবে উপভোগ করেন।

বিশেষ করে ভাসানের সময় রাস্তাঘাট সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি হয়। সমস্ত মানুষ আনন্দে গা ভাসিয়ে থাকেন। কেনাকাটা থেকে শুরু করে সমস্ত জায়গায় উৎসব, অনুষ্ঠান লেগেই রয়েছে এই দশ দিনব্যাপী। গণেশ মূর্তি ভাসিয়ে দেওয়ার পর আরও একটা বছর অপেক্ষা করতে হয় এই দিনগুলির জন্য।

Leave a Comment