বসন্ত পঞ্চমী 2022: ইতিহাস ও তাৎপর্য | Vasant Panchami 2022: History and Significance

বসন্ত পঞ্চমী 2022 (Vasant Panchami 2022 Date Time and Significance) 2022 বসন্ত পঞ্চমীর ইতিহাস এবং জানুন বসন্ত পঞ্চমী কেন পালন করা হয়? বসন্ত পঞ্চমীর তাৎপর্য কি? ভারতীয়দের জন্য বসন্ত পঞ্চমীর গুরুত্ব কতটা? জানুন সবকিছু এখানে।

শীতের আমেজ, ঘাসের আগায় শিশির ফোটা, চারিদিকে উৎসব উৎসব গন্ধ। তার মধ্যেই প্রতি বছর মাঘ মাসে শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে বসন্ত পঞ্চমী উৎসব পালন করা হয়। বিশেষ করে আমরা সবাই জানি যে, এই মাঘ মাসের পঞ্চমী তিথিতে যেটা বসন্ত পঞ্চমী নামে অনেকেই জানেন এই দিনে জ্ঞান, প্রজ্ঞা এবং বাণীর দেবী সরস্বতী দেবীর পূজা করা হয়। ধর্মীয় শাস্ত্র অনুসারে বসন্ত পঞ্চমীর দিনে মা সরস্বতীর জন্ম হয়েছিল।

সরস্বতী পূজা বিদ্যার্থীদের জন্য সবথেকে জনপ্রিয়। যে উৎসবের জন্য সারা বছর অধীর আগ্রহে থাকেন সকলেই। কৃষি নির্ভর আমাদের এই দেশ এ এই সময় থেকে শুরু হয় সর্ষের রোপন। তাই কৃষি কাজের ক্ষেত্রেও বসন্ত পঞ্চমী তিথি টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বসন্ত পঞ্চমী ইতিহাস ও তাৎপর্য - Vasant Panchami History and Significance
বসন্ত পঞ্চমী ইতিহাস ও তাৎপর্য – Vasant Panchami History and Significance

হিন্দু শাস্ত্র মতে দেবী সরস্বতী হলেন বিদ্যা, জ্ঞান, শিল্পকলা, সংগীত ও সাহিত্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। সরস্বতী পুজোর দিন শিশুদের হাতে খড়ি দেওয়ার প্রচলন আজও বিরাজমান। আর এই সরস্বতী পূজার দিন থেকেই অনেক শিশুর প্রথম অক্ষর লেখা শুরু হয় অর্থাৎ তার বিদ্যা অর্জনের যাত্রা শুরু হয়।

যেকোনো উৎসবে আমরা সকলেই সেজে উঠি। তাই সরস্বতী পূজার দিনও কিন্তু তার ব্যতিক্রম নয়। সকাল-সকাল গায়ে নিম হলুদ বাটা মেখে স্নান করেন অনেকেই। তারা বিশ্বাস করেন এর মধ্যে দিয়ে শরীরের অনেক জীবাণু নাশ হয়ে যায়।

তার সাথে সাথে উৎসবের জন্য একেবারে শুদ্ধ হয়ে উঠতে পারবেন। আগেকার দিনে এই সময় বসন্ত রোগের প্রভাব দেখা যেত খুবই সেই কারণে এই দিনে এই নিম হলুদ বাটা মাখা, এইখান থেকেই প্রচলিত হয়ে আসছে।

বসন্ত পঞ্চমীতে সবথেকে জনপ্রিয় রং হলো সাদা কিংবা হলুদ। আবার বাসন্তী রঙের পোশাক ও অনেকে পরতে পছন্দ করেন। সকাল সকাল স্নান সেরে সাদা অথবা হলুদ পোশাক পরে সরস্বতী পুজোর জন্য প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে অনেকদিন আগে থেকে।

বসন্ত পঞ্চমীর ইতিহাস:

বসন্ত পঞ্চমীতে অভ্র, আবির, যবের শিষ, আমের মুকুল, দোয়াত, কলম, বই, ইত্যাদি সহযোগে দেবী সরস্বতীর পূজার রীতি রয়েছে। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে এই দিনটি বসন্ত পঞ্চমী হিসেবে পরিচিত। কেননা এই দিন থেকে শীত ঋতুর অবসান ঘটে, বসন্তের শুভ সূচনা হয়।

বসন্ত পঞ্চমী তিথিতেই ব্রহ্মার মুখ গহ্বর থেকে দেবী সরস্বতীর সৃষ্টি হয়েছে বলে পুরানে উল্লেখ রয়েছে। এই কারণে এই দিনে সরস্বতী পূজার বিধান রয়েছে শাস্ত্রে।

বসন্ত পঞ্চমীর কাহিনী:

কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, যখন রাবণ সীতাকে অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছিলেন এবং সেই সময় সীতা তার গায়ের গয়না পৃথিবীতে ফেলে দিয়েছিলেন যাতে রামচন্দ্র তার অপহরণের পথ চিনে তার কাছে পৌঁছতে পারেন। সেই সমস্ত অলংকার গুলির মধ্যে দিয়ে রাম সীতাকে খুঁজতে লাগলেন।

এইরকম অনুসন্ধান করতে করতে রামচন্দ্র দণ্ডকারণ্যে পৌঁছে গিয়েছিলেন। যেখানে তিনি শবরির সাথে দেখা করেন, কাহিনী অনুসারে উল্লেখ আছে যে সেই দিনটি ছিল বসন্ত পঞ্চমী বা বসন্ত পঞ্চমীর দিন। তাই আজও এসব স্থানে শবরী মাতার মন্দিরে বসন্ত উৎসব পালিত হয়।

বসন্ত পঞ্চমীর তাৎপর্য: 

বসন্ত পঞ্চমীর এই উৎসব ভারতীয় জীবনযাত্রাকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করে। প্রাচীন কাল থেকে এটি জ্ঞান ও শিল্পের দেবীর সরস্বতীর জন্মদিন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিদ্যার্থী, শিক্ষাবিদরা এই দিনটির জন্য অপেক্ষা করে থাকেন, আর এই দিনে মা সরস্বতীর পূজা করা হয় এবং আরো জ্ঞানী হওয়ার জন্য তার কাছে প্রার্থনা করা হয়ে থাকে।

এই সময় লেখক, কবি, গায়ক বা যন্ত্র শিল্পী, নাট্যকার বা নৃত্যশিল্পী প্রত্যেকেই তাদের যন্ত্রের আরাধনা এবং মা সরস্বতীর পূজা দিয়ে দিন শুরু করেন। কেননা এই সমস্ত শিল্পকলার দেবী হলেন মা সরস্বতী।

বসন্ত পঞ্চমী পূজার বিধি: 

এই দিন অর্থাৎ বসন্ত পঞ্চমীর দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে মা সরস্বতীর আরাধনা করা হয়। মা সরস্বতীর মূর্তি তে হলুদ বস্ত্র দিয়ে সাজানো হয়, হলুদ ফুল অর্পণ করা হয়।

এটা বিশ্বাস করা হয় যে, এই দিন থেকে বসন্তের শুরু হয়। তাই চারপাশে হলুদ ফুল ফুটে একেবারে চারদিক সুসজ্জিত হয়ে ওঠে। সরস্বতী দেবীকে হলুদ, চন্দন, জাফরান, সাদা ফুল, হলুদ মিষ্টি নিবেদন করা হয়।

পূজোর জায়গাতে বাদ্যযন্ত্র, বই, খাতা, কলম এবং জ্ঞান অর্জনের সাথে জড়িত সমস্ত রকম জিনিসপত্র রেখে শ্রদ্ধা করে পূজা করা হয়। পূজা করার পর আরতি হয়, আরতির পরে প্রসাদ নিবেদন করা হয়।

বসন্ত পঞ্চমীতে সাদা ও হলুদ রঙের গুরুত্ব: 

সরস্বতী পূজায় হলুদ ও সাদা জিনিসের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। দেবী সরস্বতী পূজার সাদা তিলের লাড্ডু, আখ এর রস, সাদা চন্দন, মধু, সাদা বা হলুদ কাপড়, সাদা ফুল, হলুদ ফুল, সাদা অলংকার, সাদা মূলা, সাদা চাল, চিনি, পাকা কলা, নারকেল, নারকেল জল, লতাপাতা, এই সমস্ত জিনিসগুলি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তাইতো এই দিনটিতে বাসন্তী রং অথবা হলুদ বা সাদা রং এর কাপড় পরতে সকলেই পছন্দ করেন। কেননা এটি দেবীর পছন্দের রং আর এর গুরুত্ব অনেক খানি।

সবমিলিয়ে বসন্ত পঞ্চমী সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। এই উৎসব শীতের আমেজ কাটিয়ে বসন্তকাল এর আগমন ঘটে। সবাই সেজে ওঠে হলুদ অথবা সাদা বস্ত্রে, আর পূজা শেষে চলে প্রসাদ বিতরণ। অনেক শিশুর এই বসন্ত পঞ্চমীর দিন থেকে শিক্ষা অর্জনের শুভ আরম্ভ ঘটে।

Leave a Comment