স্বাধীনতা দিবস 2023: ইতিহাস ও তাৎপর্য | Independence Day 2023: History and Significance

স্বাধীনতা দিবস 2023 (Independence Day 2023 Date Time and Significance) 2023 স্বাধীনতা দিবস ইতিহাস এবং জানুন স্বাধীনতা দিবস কেন পালন করা হয়? স্বাধীনতা দিবস তাৎপর্য কি? ভারতীয়দের জন্য স্বাধীনতা দিবস গুরুত্ব কতটা? জানুন সবকিছু এখানে।

ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে পতাকা উত্তোলন, দেশ জুড়ে ছুটি, জাতীয় সংগীত এই সব নিশ্চয়ই অজানা নয়, কি তাই তো ! স্বাধীনতা দিবস হল ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের একটি জাতীয় দিবস, ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট ভারত ব্রিটিশ রাজশক্তির শাসন থেকে মুক্ত হয়ে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। সেই ঘটনাটিকে চির স্মরণীয় করে রাখার জন্য প্রতিবছর ১৫ ই আগস্ট, এই দিনে স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয়।

স্বাধীনতা দিবস ইতিহাস ও তাৎপর্য - Independence Day History and Significance
স্বাধীনতা দিবস ইতিহাস ও তাৎপর্য – Independence Day History and Significance

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে প্রথমত অহিংস, অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলন এবং বিভিন্ন চরমপন্থী, গুপ্ত রাজনৈতিক সমিতির সহিংস আন্দোলনের পথে পরিচালিত একটি দীর্ঘ সংগ্রামের পর ভারত স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। দেশ ভাগের সময়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় প্রচুর ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও ঘটে এবং ১ কোটি ৫০ লক্ষ এরও বেশি মানুষ তাদের ভিটে মাটি ছাড়া হন।

অনেক রক্ত ক্ষরণের পর ১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট জহরলাল নেহেরু, ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ গ্রহণ করার পরে দিল্লির লালকেল্লার লাহোরি গেটের উপরে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার আনন্দে সেখান থেকে প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন এবং জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন।

জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা, কুচকাওয়াজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সারাদেশে স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয় খুবই আনুষ্ঠানিকভাবে। এই দিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি এবং আরো অন্যান্য অফিস, আদালত সবকিছুতে কাজ বন্ধ থাকে এবং সমস্ত জায়গায় মিষ্টি বিতরণ করা হয়।

কিন্তু এটি একটি জাতীয় ছুটির দিন হওয়ার জন্য সব জায়গায় পঠন-পাঠন এবং কাজকর্ম সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকে। সকলে গেরুয়া, সাদা, সবুজ রঙের উৎসবে মেতে ওঠে। যা আমাদের জাতীয় পতাকার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।

স্বাধীনতা দিবসের ইতিহাস:

স্বাধীনতা দিবসের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে গেলে, ১৭ শতাব্দীর মধ্যে ইউরোপীয় বণিকরা ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের বাণিজ্য কুঠি প্রতিষ্ঠা করেছিল। ১৮ শতাব্দীর মধ্যে অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তির জোরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতের প্রধান শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করে। এরপর প্রায় এক যুগ ১৮৫৭ সালে প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধের পরের বছর ভারত শাসন আইন পাস হয়।

তারপর সেই আইন এর জোরে ব্রিটিশ রাজশক্তি কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতের শাসন ভার নিজের হাতে তুলে নেয়। পরবর্তী কয়েক দশকের মধ্যে ভারতে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত এক নাগরিক সমাজের উদ্ভব ঘটে।

এই সময়ে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ঘটনাটি হল ১৮৮৫ সালে বোম্বাইয়ের গোকুল দাস তেজ পাল সংস্কৃত কলেজে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ সরকার ভারতীয় প্রশাসন ব্যবস্থার কিছু সংস্কার সাধনে যুক্ত হয়, মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার ছিল এর মধ্যে সবথেকে অন্যতম।

কিন্তু সেই সঙ্গে রাওলাট আইনের মতো দমন মুলক আইনও পাস করা হয় এবং ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামীরা স্বায়ত্ত শাসনের দাবি তোলেন। এক্ষেত্রে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী অর্থাৎ মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অহিংস, অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলন হয়।

এরপর ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতের প্রশাসনিক সংস্কার সংক্রান্ত প্রস্তাবটিকে আইনত বিধিবদ্ধ করে। এই আইনে যে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল, সেই নির্বাচন গুলিতে জয়লাভ করে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ভারতের অংশগ্রহণ শেষবারের জন্য অসহযোগের পথে কংগ্রেসের আন্দোলন তার পাশাপাশি অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের নেতৃত্বে মুসলিম জাতীয়তাবাদের উত্থানের মত ঘটনাগুলিও ঘটে এই দশকেই।

তারপর বৃদ্ধি পাওয়া রাজনৈতিক উত্তেজনা হ্রাস পায় ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জন করার পর অর্থাৎ বলা যেতে পারে, স্বাধীনতা অর্জন করার সাথে সাথে ক্রমশ বৃদ্ধি পাওয়া রাজনৈতিক উত্তেজনা কমতে থাকে। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের আনন্দ অনেকখানি বিঘ্নিত হয়েছিল ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের মধ্যে উপমহাদেশ বিভাজন হওয়ার ঘটনা তে।

ভারত স্বাধীন হওয়ার আগে স্বাধীনতা দিবস পালন:

১৯২৯ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের লাহোর অধিবেশনে পূর্ণ স্বরাজ ঘোষণাপত্র অথবা ভারতের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গৃহীত হয় ২৬ শে জানুয়ারি। এই তারিখটিকে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে ছিল কংগ্রেস। জনগণকে আইন অমান্যের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার ডাক দেয় এবং যতদিন না পর্যন্ত ভারত সম্পূর্ণ ভাবে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারছে, ততদিন পর্যন্ত কংগ্রেসের নির্দেশ পালন করতে বলা হয়।

ভারতীয় নাগরিকদের মধ্যে একটি জাতীয়তাবাদী অনুভূতি জাগরিত করে তোলার জন্য ব্রিটিশ সরকারকে স্বাধীনতা অনুমোদনে বাধ্য করার জন্য একটি স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। আর সেই কারণেই ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত ২৬ শে জানুয়ারি, এই তারিখটি কংগ্রেস স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করেছিল।

সেই সময় স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সভার আয়োজন করা হতো এবং সেই সমস্ত সভায় আগত ব্যক্তিগণ স্বাধীনতার শপথ গ্রহণ করতেন, জহরলাল নেহেরু এবং তার আত্মজীবনীতে এই সভা গুলিকে শান্তিপূর্ণ এবং কোনরকম ভাষণ বা উপদেশ বিবর্জিত বলে বর্ণনা করেছেন।

মহাত্মা গান্ধী ও এই স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সভার পাশাপাশি আরো অনেক কিছুর চিন্তাভাবনা পরিকল্পনা করেছিলেন। তিনি মনে করেন এই দিনটি পালন করা উচিত, কিছু সৃজনশীল কাজ করা উচিত।

যেমন ধরুন চরকা কাটা, হিন্দু- মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং আইন অমান্য করা অথবা এই সবগুলি একসঙ্গে করা। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের সংবিধান বিধিবদ্ধ হয় ১৯৫০ সালের ২৬ শে জানুয়ারি। এরপর ২৬ শে জানুয়ারি এই তারিখটি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

“মুক্তিরও মন্দিরও সোপানো তলে, কত প্রাণ হলো বলিদান লেখা আছে অশ্রু জলে। কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা, বন্দিশালার ওই শিকল ভাঙ্গা.., তারা কি ফিরবে আর.. সুপ্রভাতে, কত তরুণ অরুণ গেল অস্তাচলে..” 

শিহরণ জাগানো এই লাইনগুলোর মাধ্যমে আজও আমাদেরকে সেই সমস্ত বীরোদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে মাথা নিচু করতে হয়। যারা নিঃস্বার্থভাবে দেশের জন্য লড়াই করতে করতে তাদের তাজা তাজা প্রাণগুলো বিসর্জন দিয়েছেন দেশের মাটিতে। কত প্রাণ বলি দিতে হয়েছে তারপরেই পাওয়া গিয়েছে এই স্বাধীনতা দিবস।

প্রকৃত অর্থে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের একটি জাতীয় দিবস এই প্রজাতন্ত্রের স্বাধীনতাকে ব্রিটিশদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে প্রাণ গিয়েছে বহু বীর বিপ্লবী এবং বীরাঙ্গনা নারীর। এছাড়া ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন এর ক্ষেত্রে কিছু মানুষের পরিশ্রম ছিল অব্যর্থ। যার ফলে ব্রিটিশদের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে ভারত।

ক্ষুদিরাম, মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রফুল্ল চাকী, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, এমন অনেক শত শত বিপ্লবীদের প্রাণের উৎসর্গে আমাদের ভারত আজ সম্পূর্ন স্বাধীন। সেই কারণে ভারতের ইতিহাসে এই ১৫ ই আগস্ট দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম।

১৯৪৭ সালের ১৫ ই আগস্ট ভারত ব্রিটিশ রাজশক্তি শাসনের থেকে মুক্ত হওয়া এই স্বাধীন ভারত আমাদের কাছে এক উপহার স্বরূপ, আর সেখান থেকেই এই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য প্রতিবছর খুবই জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে স্বাধীনতা দিবস পালন করা হয়।

বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাগুলি, সরকারি ভবন গুলিতে পতাকা উত্তোলন করা হয়। এই দিন সমস্ত স্কুল, কলেজেও পতাকা উত্তোলন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সমস্ত জায়গায় মিষ্টি বিতরণ এবং চারিদিকে জাতীয় পতাকার শ্রদ্ধার জয় গান আমাদের মনকে উৎফুল্ল করে তোলে, আকাশে, বাতাসে, পরিবেশে আনন্দের প্রতিচ্ছবি।

ছোট ছোট ছেলে মেয়েরাও এই স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী দের সাজ পোশাক পরে শোভাযাত্রা করে। যা তাদের মনে আনন্দ প্রদান করার পাশাপাশি, দেশের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি জাগাতে সাহায্য করে।

দেশের মাটি ফিরে পাওয়ার লড়াই, যুদ্ধ, আন্দোলন আর নিজেদের স্বতন্ত্রতা বাঁচিয়ে রাখার অক্লান্ত চেষ্টা থেকে ভারতবর্ষের মুক্তির স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা আর চাহিদায় দিন গুনে ছিলেন ভারতের প্রতিটি মানুষ। এর জন্য অন্যায়, অত্যাচার কম সহ্য করতে হয়নি তাদের। তবে যাই হোক না কেন, শহীদের রক্ত বিফলে যায়নি, স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মত্যাগ ভারত স্বাধীন হওয়ার পর তাদেরকে মৃত্যুঞ্জয়ী করে দিয়েছে।

নিজের অধিকার ফিরে পাওয়ার লড়াই, অনেক প্রতিশোধ এবং স্বাধীনতা আন্দোলনের দ্বারা ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী দের দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। তবে সেই পথ খুব একটা সহজ ছিল না, যা ছিল খুবই কঠিন আর দুর্গম। কারাবাস, মৃত্যুদণ্ড এবং ভারত জুড়ে সাহিত্য মহল, বিজ্ঞানী, রাজনীতিবিদ এবং সাংবাদিকদের নিয়ন্তর লড়াই চলেছিল এই সময়।

অবশেষে বলা যায় যে, ১৫ ই আগস্ট এই দিনটি শুধুমাত্র একটি জাতীয় দিবস হিসেবে পালন না করে, এর যথাযথ তাৎপর্য উপলব্ধি করা প্রয়োজন। আমাদের দেশকে হিংসা, হানাহানি, মারামারি, জাতি বৈষম্য, ভেদাভেদ থেকে মুক্ত করার জন্য নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে আসতে হবে। যেন মানুষে মানুষে প্রেম- প্রীতি -ভালবাসা বজায় থাকে। ভেদাভেদ, হীনমন্যতা যেন না থাকে। তবেই না ভারত স্বাধীন হওয়ার আনন্দটা সম্পূর্ণ ভাবে উপভোগ করা যাবে, তাই নয় কি !

Leave a Comment