মানস শক্তিপীঠ: যেখানে সতীর ডান হাত পতিত হয়েছিল, আজানা ইতিহাস

(Manas Shakti Peeth in Bengali) মানস শক্তিপীঠের বর্তমান অবস্থান কোন স্থানে? দেবী সতীর কোন অঙ্গ এখানে পতিত হয়েছে? মানস শক্তিপীঠের পৌরাণিক কাহিনী কি? কিভাবে আরাধনা করা হয়? এই মন্দিরের তাৎপর্য কি? জানুন সবকিছু বিস্তারিত।

৫১ টি সতি পীঠ এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য সতীপীঠ হল মানস সতীপীঠ অথবা মানস শক্তিপীঠ। যেটি তিব্বতের মানস সরোবরের কাছে অবস্থিত। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, এখানে সতীর ডান হাত পতিত হয়েছিল।

Manas Shakti Peeth in Bengali - মানস শক্তিপীঠ
Manas Shakti Peeth in Bengali – মানস শক্তিপীঠ

মানস সতী পীঠে অধিষ্ঠিত দেবী হলেন দাক্ষায়নী এবং ভৈরব হলেন হর। বিভিন্ন মত অনুসারে মানুষ সতীপীঠের ভৈরব এর নাম অমর।

মানস শক্তিপীঠ:

শক্তিপীঠের নাম মানস শক্তিপীঠ
স্থান মানস, মানস সরোবর হ্রদে কৈলাশ পর্বতের পাদদেশে অবস্থিত, তিব্বত
দেশ চীন
দেবীর অংশ ডান হাত
শক্তির নাম দাক্ষায়ণী

মানস শক্তি পীঠের ভৌগোলিক গুরুত্ব:

মানস সতী পীঠের মাহাত্ম্যের সবচেয়ে বড় কারণ পার্শ্ববর্তী মানস সরোবর। হিমালয়ের কোলে অবস্থিত সমুদ্র তল থেকে প্রায় ১৬ হাজার ফুট উচ্চতায় বিরাট আকারের এই সমুদ্র সমান হ্রদ টি বেশ গভীর। এছাড়াও এই হ্রদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক পৌরাণিক কাহিনী।

এছাড়া হিন্দুরা মনে করেন যে, এই কৈলাস পর্বতে মহাদেব শিবের বাসস্থান রয়েছে। তিব্বতে অবস্থিত এই কৈলাস এবং মানস সরোবরকে কেন্দ্র করেই এই মানস শক্তি পীঠটি গড়ে উঠেছে। আর তাই একদিকে সতীর মাহাত্ম্য থাকলেও অন্যদিকে এখানে শৈব মাহাত্ম্যও বিদ্যমান রয়েছে।

মানস শক্তি পীঠের পৌরাণিক কাহিনী:

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে আমরা সকলেই জানি যে, মাতা সতী বাবার কাছ থেকে স্বামীর অপমান সহ্য করতে না পেরে নিজের বাপের বাড়িতেই দেহ ত্যাগ করেছিলেন। খবর পেয়ে মহাদেব সেখানে উপস্থিত হয়ে দেবীর দেহ কাঁধে করে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য শুরু করে দেন।

মহাদেবের সেই তান্ডব নৃত্য পৃথিবী ধ্বংসের কারণ হওয়ার উপক্রম হয়, আর সেই জন্য মহাদেবকে শান্ত করার একমাত্র উপায় ছিল দেবীর মৃতদেহকে খন্ড-বিখন্ড করা।

আর তাইতো শ্রীবিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর দেহটি ৫১ টি খন্ডে বিভক্ত করে দেন। সেই দেহ খন্ড গুলিই যে যে জায়গায় পড়েছিল সেখানে সেখানে একটি করে সতীপীঠ অথবা শক্তিপীঠ প্রতিষ্ঠা হয়। সেই রকম ভাবেই একটি সতীপীঠ হল এই মানস সতীপীঠ। বলা হয় যে, সতীর ডান হাত মাটিতে পড়েই জন্ম হয়েছে এই মানস শক্তি পীঠের।

মানস শক্তি পীঠের মাহাত্ম্য:

প্রতিটি তীর্থস্থান মানুষকে ধন্য করে, আর সেই রকম ভাবেই মানস শক্তি পীঠের সঙ্গে ওতোপ্রোত  ভাবে জড়িয়ে আছে মানস সরোবরের সৃষ্টিতত্ত্ব।

মানস সরোবর কিভাবে সৃষ্টি হল ? তার উত্তরে জানা যায় যে, স্কন্দ পূরণে কথিত আছে যে, ব্রহ্মার মন থেকে সৃষ্ট হয়েছিল একটি বিশাল হ্রদের কথা, তিনি ভেবেছিলেন এমন একটি সরোবর, যে সরোবরে স্নান করলে রজ, তমো গুণ থেকে সাত্ত্বিক গুনে অধিষ্ঠিত হওয়া যায়।

আর তাই হিমালয়ের উপরে ৩০ যোজন পরিধি বিশিষ্ট বিশাল একটি হ্রদ তৈরি করলেন তিনি। ব্রহ্মা মানস জাত বলে, এই হ্রদের নাম হলো মানস সরোবর।

এছাড়াও হিমালয়ের বুকে প্রায় ২২ হাজার ফুট উঁচু কৈলাস পর্বতের কাছে এই মানস সরবরের পবিত্র কুণ্ডকেই সতী পীঠ হিসেবে মনে করা হয়। হিন্দুদের বিশ্বাস অনুসারে এই কৈলাস পর্বত শিবের বাসস্থান আবার জৈনদের মত অনুসারে আদিনাথ ঋষভদেব এই পর্বতেই সাধনা করে সিদ্ধি লাভ করেছিলেন।

আকৃতির দিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, মানুষ সরোবর ৪০০ কিলোমিটার এর ও বেশি জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। এর পশ্চিম দিকে রয়েছে রাক্ষস স্থল তথা রাবণ হ্রদ আর উত্তর দিকে আছে কৈলাস পর্বত।

এই মানুষ সরোবরের সতী পীঠের মাহাত্ম্য এতটাই যে, অনেকে রাত্রে কৈলাস পর্বতের উপরে দুটি আলোকছটা দেখতে পান। যাকে দৈব আলোক জ্যোতিও বলা হয়। সেই আলোক ছটা পরস্পরের অনুগামী। মানুষের বিশ্বাস অনুসারে এই আলোক ছটাই আসলে শিব এবং পার্বতীর প্রতিরূপ।

কৈলাস পর্বতের অপার সৌন্দর্য আর মানস সরোবরের প্রশান্তি এই সতী পীঠের অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলাই যায়। যেখানে তীর্থ ভ্রমণ করার পাশাপাশি আপনি ঈশ্বরের লীলা ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য একসাথে উপভোগ করতে পারবেন।

মানস শক্তি পীঠের ইতিহাস:

ঈশ্বর পৃথিবী কে কত সুন্দর করে সৃষ্টি করেছেন তা আমরা নিজেদের চোখেই দেখতে পাই। প্রকৃতি কত সুন্দর যা দেখে স্বর্গের সৌন্দর্য অনেকখানি আন্দাজ করাই যায়। প্রকৃতি এখানে সতী দেবীর মূর্তি সমান।

অনেকের ধারণা অনুসারে জানা যায় যে, রাজা মান্ধাতা এই হ্রদ টি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন, আর তার নাম অনুসারে এই সরোবরের দক্ষিণ দিকে দেখা যায় মান্ধাতা শৈল শ্রেণীকে। তবে আলাদা করে এখানে কোনরকম মন্দির নির্মাণ করা হয়নি। দেবী মহামায়া এখানে পরম প্রকৃতির রূপে ধরা দেন, ভক্তদের কাছে।

তাই এখানে যেমন কোন মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়নি, তেমনি কোনরকম দেবী মূর্তিও এখানে নেই, বলতে গেলে নিরাকার। এই শক্তি আদি শক্তির একটি বিশেষ রূপ হিসেবে সকলের কাছে পরিচিত। প্রত্যেকটি সতীপীঠ অথবা শক্তি পীঠে দেবী এবং ভৈরব প্রতিষ্ঠিত থাকেন।

দেবী হলেন সতীর রূপ আর ভৈরব হলেন দেবীর স্বামী। এখানে দেবীর দখায়নি নামে পরিচিত এবং ভৈরব হলেন হর, “হর হর মহাদেব” তবে অনেকেই আবার এই ভৈরব কে অমর এবং দেবীকে কুমুদা বলেও অভিহিত করে থাকেন।

সারা বছরজুড়ে প্রায় সব সময় এই শক্তি পীঠে ভক্তদের আনাগোনা চলতেই থাকে। আর ভিড় জমিয়ে থাকেন অনেক পুণ্যার্থী, মানব সরোবর এবং কৈলাস পর্বত দেখতে বহু মানুষ এখানে ছুটে আসেন সকল বাধা পেরিয়ে।

হিন্দু ধর্ম অনুসারে এই সরোবরের মাহাত্ম্য অনেকখানি। মানস সরোবরের ধারে এসে অনেক পূন্যার্থী পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণ ও করে থাকেন। যা কিনা অনেকখানি পূণ্যের কাজ।

মানস সরোবরের সেই পর্বত চূড়া মনকে একেবারে শান্ত ও মোহিত করে তুলবে আপনার। তিব্বতে প্রচুর সন্ন্যাসী সাধক দেখা যায়। দেবী দাক্ষায়নী, তিনি ছিলেন দক্ষ প্রজাপতির কন্যা, প্রজাপতি ব্রহ্মার আদেশের দক্ষ আর তার স্ত্রী বিরনী মহামায়ার কঠোর তপস্যা করেন।

অগণিত ভক্তদের বিশ্বাস এখানে স্বর্গের দেবতা, দেবী, গন্ধর্ব, অপ্সরা সকলেই আসেন। রাত্রের সময় আকাশের চাঁদের আলোতে এই স্থান আরো সুন্দর ও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। মনে হয় যেন সত্যিই এটি একটি স্বর্গ আর এখানে দেবতারা ঘোরাফেরা করছেন।

তাই তো এত সুন্দরভাবে সেজে ওঠে চারিদিক, প্রকৃতিও যেন আরো বেশি রঙিন হয়ে ওঠে। মানস সরোবরের পশ্চিম দিকে কিছু গুহা আছে বর্তমানে এগুলি গুম্ফা হয়েছে, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীগণ এখানে থাকেন।

আর এমন একটি সুন্দর জায়গায় যদি আপনি তীর্থ ভ্রমণ করতে চান, তাহলে আপনার পরিকল্পনা সফল হোক। এই শক্তি পীঠে থাকাকালীন আপনার মন অনেক খানি শান্ত ও স্নিগ্ধ হবে সেটা আশা করাই যায়। প্রতিটি শক্তিপীঠ তে পৌঁছাতে গেলে কিছুটা দুর্গম রাস্তা তো পেরোতেই হয়।

তবে তার মধ্যে রয়েছে অনেকটাই রোমাঞ্চকর মুহূর্ত ও তার সাথে অনেকখানি উৎসাহ ও ভালোলাগা। আর এখানে তীর্থ যাত্রা করতে গেলে আপনার জীবন যে ধন্য হবে সেটা আর বলার প্রয়োজন নেই।

Leave a Comment