আমড়া চাষের সঠিক ও সহজ পদ্ধতি | Spondias Mombin Cultivation Method in Bangla

আমড়া একটি অতি পরিচিত ফল। এটি ভিটামিন সি যুক্ত ফল। পুষ্টিগুণে ভরপুর এ ফল দিয়ে জ্যাম, জেলী, আচার তৈরি করা হয়। কোন কোন জাত একটু মিষ্টি হয়ে থাকে। বাজারে এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে।

আজ আমরা আপনাদের সাথে আমড়া চাষের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব। এতে করে আপনারা সহজেই আমড়া চাষের বিস্তারিত জানতে পারবেন।

Spondias Mombin Cultivation Method in Bangla
Spondias Mombin Cultivation Method in Bangla

আমাদের বাংলাভূমি সাইটে নিয়মিত আমরা আপনাদের সাথে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করে থাকি। এর ফলে আপনারা কৃষি জমি, শিক্ষা, অর্থনীতি এসব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে থাকেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রয়োজনে আপনারা এ সকল তথ্য থেকে উপকৃত হয়ে থাকেন। চলুন দেখে নিন আমড়া চাষের বিস্তারিত

মাটি ও জলবায়ুঃ

আমড়া চাষের  জন্য মাটি গভীর হতে হবে। জমি সুনিষ্কাশিত ও উচু হতে হবে। আমড়া চাষের জন্য উর্বর দোআঁশ মাটি প্রয়োজন। সাধারনত গ্রীষ্ম মন্ডলীয় আবহাওয়ায় আমড়া ভালো হয়ে থাকে।

বংশ বিস্তারঃ

আমড়া সাধারনত বীজ বা কলমের মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধি করে থাকে। একটি পরিপক্ক আমড়া বীজ থেকে শাঁস ছাড়িয়ে তারপর বালিতে রোপন করা হয়।

তারপর চারা গজালে সেই চারা ছোট অবস্থায় তুলে আনতে হয় এবং মাটিতে সার ও বালি মিশিয়ে সেই চারা অন্য স্থানে রোপন করতে হয়। সেখানে চারা গুলো আস্তে আস্তে বড় হয়।

একটি বীজ থেকে কখনো কখনো এক বা একাধিক চারা হতে পারে। একটি আমড়ার বীচে তিন থেকে চার টি অংশ থাকে যেখান থেকে এই চারার অঙ্কুরোদগম হয়ে থাকে।

বীজের চারাতে আমড়ার বংশ গত গুনুগুন বজায় থাকে। তাছাড়া কলমের মাধ্যমে ও বংশ বিস্তার হয়ে থাকে।

রোপন সময়ঃ

আমড়ার চারা সাধারনত বর্ষাকালের শুরুর দিকে লাগানো উচিত। বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ মাসের দিকে আমড়ার চারা লাগানোর উপযুক্ত সময়।

জমি তৈরিঃ

জমি ভালো ভাবে চাষ ও মই দিয়ে তৈরি করে নিতে হবে। জমির মাটি সমতল করে নিতে হবে এবং জমি আগাছা মুক্ত করে নিতে হবে।

আমাড়ার চারা রোপন করার জন্য সমতল জমির মধ্যে বর্গাকারে বা আয়তাকারে চারা রোপন করতে হবে । যদি পাহাড়ি জমিতে রোপন করা হয় তাহলে কন্টুর পদ্ধতিতে রোপন করতে হবে।

চারা রোপন করার জন্য গর্ত তৈরি করতে হবে। গর্ত ৬০×৬০×৬০ সেমি হবে এবং গর্তে সার প্রয়োগ করতে হবে। প্রতি গর্তে ২০ কেজি জৈব সার, ২০০ গ্রাম টিএসপি এবং ৫০ গ্রাম জিপসাম দিতে হবে।

গর্ত তৈরি করার ১৫-৩০ দিন পর গর্তে চারা লাগাতে হবে। চারা লাগানোর সময় খেয়াল রাখতে হবে চারার গোড়া যেন সোজা হয়।

চারা রোপন করার পর জমিতে হালকা সেচ দিতে হবে। চারার চারপাশে খুটি ও বেড়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে।

সার প্রয়োগঃ

আমড়া গাছে সাধারনত এক বছরে দুই বার সার প্রয়োগ করা ভালো। প্রথম কিস্তি দিতে হবে বর্ষা শুরুর দিকে তারপর দ্বিতীয় কিস্তি দিতে হবে বর্ষার শেষ দিকে।

সার প্রয়োগ করতে হবে যখন মাটিতে জো আসবে তখন।

সার প্রয়োগের পরিমানঃ

চারা লাগানোর পর জমিতে প্রয়োজনীয় জৈব সার ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হবে।

১-২ বছর বয়সী চারার ক্ষেত্রে গোবর সার দিতে হবে ৫-১০ কেজি,

ইউরিয়া দিতে হবে ১০০ গ্রাম,

টিএসপি দিতে হবে ১৫০ গ্রাম,

এমপি দিতে হবে ১০০ গ্রাম, জিপসাম দিতে হবে ৫০ গ্রাম।

৩-৪ বছর বয়সী সারের ক্ষেত্রে জৈব সার দিতে হবে ১০-১৫ কেজি,

ইউরিয়া দিতে হবে ১৫০ গ্রাম, টিএসপি দিতে হবে ২০০ গ্রাম, এমপি দিতে হবে ১৫০ গ্রাম,

জিপসাম দিতে হবে৬০ গ্রাম।

গাছের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সারের পরিমান বাড়বে।

সেচ প্রয়োগঃ

গাছ ভালোভাবে বৃদ্ধির পাওয়ার জন্য শুকনা মৌসুমে গাছে সেচ দিতে হবে। তবে গাছের গোড়ায় যেন জল জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

প্রয়োজনে নালা তৈরি করে দিতে হবে যেন অতিরিক্ত জল বের হয়ে যেতে পারে।

ছাটাইঃ

প্রথম ১-২ বছর গাছে কোন ফল না রাখা ভালো। যদি এ সময় ফুল ধরে তাহলে সেই ফুল ফেলে দেওয়া উচিত। তাহলে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়। দুই বছর পর থেকে গাছে প্রচুর পরিমান ফুল আসে।

গাছে যদি অতি মাত্রায় ফল আসে তাহলে কিছু ফল ছাটাই করে দেয়া ভালো। এক্ষেত্রে ২০-৩০% ফল ফেলে দেয়া উচিত। তাহলে গাছের সব ফলের বৃদ্ধি বেশি হবে এবং ফলের গুনগত মান ও খুব ভালো হবে।

রোগ দমন ব্যবস্থাপনাঃ

আমড়া চাষে চারার সাধারনত অঙ্কুরোদগমের সময় ডাম্পিং অফ নামে রোগ দেখা দেয়। বীজের অঙ্কুরোদগম যদি বালিতে করানো হয় তাহলে এ রোগ খুব কম দেখা দেয়।

কিছু কিছু আমড়ার বড় গাছে রোগ কম দেখা দেয়। তবে আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি থেকে শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত গাছে বিটল পোকার উপদ্রব দেখা দিতে পারে।

এই পোকা গাছের পাতা খেয়ে ফেলে এবং ফলের ও অনেক ক্ষতি করে থাকে। তাই এ পোকার আক্রমণে ম্যালাথিয়ন প্রতি লিটার জলের সাথে মিশিয়ে স্প্রে করে দিতে হবে।

আবার গাছ থেকে পোকা সংগ্রহ করে মেরে ফেললে ও পোকা দমন সহজ হয়।

ফল সংগ্রহঃ

আমড়া পরিপক্ক হলে তা গাছ থেকে সংগ্রহ করতে হবে। ফল পরিপক্ক হলে তার রঙ হালকা সবুজ রং হয় এবং গায়ে বাদামি বর্ণের প্যাচ তৈরি হয়।

যদি চারা তৈরি করতে হয় তাহলে সেই আমড়া গাছে কিছুটা পাকিয়ে নেয়া ভালো। পাকা আমড়া হালকা হলুদ বর্ণ ধারন করে।

ফলনঃ

জাত অনুযায়ী আমড়ার ফলন কম বেশি হয়ে থাকে। দেশি জাতের একটি আমড়া গাছ থেকে ফলন হয় ২০০-৩০০ কেজি আর অন্য প্রজাতি থেকে ফলন হতে পারে ২৫০-৪০০ কেজি।

Leave a Comment