প্রয়াগ শক্তিপীঠ: যেখানে সতীর হাতের দশটি আঙ্গুল পতিত হয়েছিল

(Prayag Shakti Peeth in Bengali) প্রয়াগ শক্তিপীঠের বর্তমান অবস্থান কোন স্থানে? দেবী সতীর কোন অঙ্গ এখানে পতিত হয়েছে? প্রয়াগ শক্তিপীঠের পৌরাণিক কাহিনী কি? কিভাবে আরাধনা করা হয়? এই মন্দিরের তাৎপর্য কি? জানুন সবকিছু বিস্তারিত।

হিন্দু দেব-দেবীদের মহিমা অপার, আর এই মহিমাতে হিন্দু ধর্মাবলম্বী দের বিশ্বাস অনুসারে পূজা অর্চনার মধ্যে দিয়ে নিজেদের মনের ইচ্ছা জানিয়ে থাকেন। বিভিন্ন ধরনের তীর্থস্থানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তীর্থস্থান গুলি হল দেবীর ৫১ টি সতী পীঠ। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে দক্ষযজ্ঞ তে সতীর দেহ কাঁধে নিয়ে মহাদেব যখন তান্ডব নৃত্য তে মেতে ছিলেন।

Prayag Shakti Peeth in Bengali - প্রয়াগ শক্তিপীঠ
Prayag Shakti Peeth in Bengali – প্রয়াগ শক্তিপীঠ

তখন বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দিয়ে খন্ড বিখন্ড করে ফেলেন দেবীর দেহ, আর সেই খন্ড খন্ড দেহ অংশগুলি পৃথিবীর বুকে যে যে জায়গায় পতিত হয়েছিল, সেখানে সেখানে এক একটি করে সতীপীঠ গড়ে উঠেছে।

তার মধ্যে একটি অন্যতম সতী পীঠ অথবা শক্তি পীঠ হল উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদের ত্রিবেণী সঙ্গমে অবস্থিত প্রয়াগ শক্তিপীঠ। যা কিনা ৫১ টি সতী পীঠের মধ্যে একটি অন্যতম পীঠ।

প্রয়াগ শক্তিপীঠ:

শক্তিপীঠের নাম প্রয়াগ শক্তিপীঠ
স্থান প্রয়াগ, সঙ্গমের নিকট, প্রয়াগরাজ, উত্তরপ্রদেশ
দেশ ভারত
দেবীর অংশ হাতের দশটি আঙ্গুল
শক্তির নাম ললিতা

প্রয়াগ শক্তি পীঠ:

এই পবিত্র স্থানটি এলাহাবাদের ত্রিবেণী সঙ্গম এ অবস্থিত। সাধারণভাবে তীর্থযাত্রীদের কাছে একটি পবিত্র স্থান। কারণ এই স্থান গঙ্গা, যমুনা এবং সরস্বতী নদীর মিলন স্থল।

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, এখানে সতীর হাতের দশটি আঙুল পতিত হয়েছিল। এখানে অধিষ্ঠিত দেবী অলোপি মাতা অর্থাৎ ললিতা রূপে পূজিতা হন এবং ভৈরব হলেন ভব, অনেকের মধ্যে এখানে ভৈরব হলেন বেনীমাধব।

সতী দেবীর “অলোপি” নামের মাহাত্ম্য:

প্রতিবছর নবরাত্রীর সময় এই প্রয়াগ শক্তি পীঠে বহু পুণ্যার্থী ও ভক্তদের সমাগম ঘটে। দেবীর অলোপি নামকরণ নিয়ে অনেক গুলি পৌরাণিক ধারণা প্রচলিত আছে, যা থেকে এই শক্তি পীঠের উৎপত্তি বা গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা করা যায়।

সতী এখানে দেবী অলোপি নামে পুজিতা, অলোপী কথার অর্থ হল লুপ্ত না হওয়া, সতীর দেহ যখন বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের আঘাতে খন্ড-বিখন্ড হয়, তখন সর্বশেষ এই প্রয়াগেই দেবীর ১০ আঙ্গুল ছিন্ন হয়ে ভূ-পতিত হয়েছিল।

এর ফলে সতীর দেহ লুপ্ত হয়ে যায়। তবে হ্যাঁ দেবীর অস্তিত্ব রক্ষিত ছিল ওই দেহ খণ্ড গুলির মধ্যেই। তাই লুপ্ত হয়েও দেবীর নাম হয় অলোপি।

প্রয়াগ মন্দির (শক্তিপীঠ) এর ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনী:

আবার অনেক স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস অনুসারে জানা যায়, বহু প্রাচীনকালে এই ত্রিবেণী সঙ্গম অঞ্চল ঘন বন জঙ্গলে ঢাকা ছিল, আর সেই সব ঘন জঙ্গলে থাকতো দুর্ধর্ষ সব ডাকাত। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যখনই কোন বিবাহ যাত্রীর দল যেত, ডাকাতরা তাদেরকে আটক করে সর্বস্ব লুট করে নিত।

একবার এই রকম ভাবেই এক বিবাহ যাত্রীর দলকে আক্রমণ করে সকল পুরুষকে হত্যা করে যখন ডাকাতরা পালকির দিকে ছুটে যায়, সেখানে অবিশ্বাস্য ভাবে তারা দেখে কোনো কনে সেখানে উপস্থিত ছিল না। এই কনের অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ঘটনা ছড়িয়ে পড়ে সর্বত্রই এবং তা কালের বিবর্তনে এক অলৌকিক ঘটনায় পরিণত হয়। পুরানে আছে যে, সত্য যুগে ভন্ডাসুর প্রবল প্রতাপে শিবের বর পেয়ে দেবতাদের হেনস্থা করতে শুরু করে।

তারপর ইন্দ্রের স্ত্রী শচী দেবীকে পাওয়ার উদ্দেশ্যে অসংখ্য অসুর সেনা নিয়ে কৈলাসে আক্রমণ করে। দেবতারা অসুরদের হত্যা করলেও ভন্ডাসুর মহামায়া বলে প্রাণ ফিরে পায় এবং তারপর আরো তীব্রভাবে আঘাত করতে শুরু করে। এই সময় ইন্দ্র এবং আরও অন্যান্য দেবতারা যজ্ঞের মাধ্যমে মহাশক্তির জাগরণ ঘটান।

তখনই যজ্ঞের আগুন থেকে রক্ত বস্ত্র পরিহিতা চতুর্ভূজা দেবী ললিতার আবির্ভাব ঘটে। ভন্ডাসুর এর সঙ্গে যুদ্ধ করে ললিতা সর্বলোক পুনরায় অসুর মুক্ত করে দেন। প্রয়াগ শক্তিপীঠে মূলত তিনটি মন্দির আছে, অক্ষয়বট, মীরাপুর এবং অলোপি। এছাড়াও এই সতী পীঠ সপ্ত মোক্ষপুরের অন্যতম একটি সতীপিঠ।

এই মন্দিরের বিশেষত্ব হলো এখানে কোন দেবী মূর্তি নেই, তার পরিবর্তে এখানে একটি কাঠের পালকিকে দেবী রূপে পূজা করা হয়। ওই যে আগের ঘটনায় জানা গেল যে, পালকিতে কোনো রকম কনে ছিল না, তাই পালকিকেই দেবী রূপে পূজা করা হয়। তবে এর পাশে নব দূর্গার বিগ্রহ রয়েছে। তার পাশাপাশি দেবীর বেদির নিচে একটি গর্ত তে  জল আছে। মনে করা হয় যে, এই জল আসলে স্বয়ং মা গঙ্গার। অক্ষয় বটের নিচে দেব ভৈরবের মন্দির গড়ে উঠেছে।

দেবী ও ভৈরব:

প্রত্যেকটি সতী পীঠ অথবা শক্তি পীঠে দেবী আর ভৈরব এর অধিষ্ঠান থাকে, দেবী হলেন সতীর রূপ আর ভৈরব হলেন দেবীর স্বামী। সেই রকম ভাবে প্রয়াগ শক্তি পীঠে দেবী হলেন ললিতা তথা অলোপি এবং ভৈরব হলেন ভব তবে অনেকেই আবার ভৈরব কে বেনীমাধবও বলে থাকেন।

প্রয়াগ এই জায়গাটি সাধারণভাবে কুম্ভ মেলার জন্য বিখ্যাত হলেও প্রয়াগ শক্তি পীঠে নবরাত্রি উৎসব খুবই জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে পালন করা হয়।

এই উৎসব অনুযায়ী এই দিনে বহু জায়গা থেকে পুণ্যার্থী ও ভক্তরা দেবী ললিতার মন্দিরে ভিড় জমান। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, এমন কি দেশের বাইরে থেকেও অনেক ভক্তদের সমাগম ঘটে এই মন্দিরে।

নবরাত্রীর সময় এখানে প্রচুর লোক জমা হয়, নিয়ম মত নারকেল ফাটিয়ে নারকেলের জল দেবীকে অর্পণ করে অর্ধেক নারকেল মন্দিরের সমর্পণ করেন ভক্তরা। স্থানীয় মানুষজন দেবীকে অলোপি মাঈ নামেও ডাকেন।

এখানে দেবীর ভৈরব বেণীমাধবের মন্দির টি পবিত্র অক্ষয় বটের নিচে অবস্থান করছে। ভৈরব মন্দির দেবীর মন্দির থেকে কিছুটা দূরে অবস্থিত। দশমহাবিদ্যার তৃতীয় মহাবিদ্যা ষোড়শী দেবী হলেন শ্রী ললিতা। এই শক্তি পীঠে  সতীর দুই হাতের মোট দশটি আঙ্গুল পতিত হয়ে জন্ম হয়েছে প্রয়াগ সতী পীঠ এর।

প্রতিটি তীর্থস্থান ঘুরে দেখার মধ্যে দিয়ে মানুষের মনে ভক্তি সঞ্চার হয়, তার পাশাপাশি জীবন ধন্য হয়। তাছাড়া এই সতীপীঠ গুলি সতীর দেহের অংশ পড়ে তৈরি হয়েছে তাই এই খানে গিয়ে দেবীর দর্শন করা সত্যি সৌভাগ্যের বিষয়। বলা যেতে পারে দেবীর খন্ড দেহ অংশগুলি এই পৃথিবীতে পড়ে পৃথিবীকে ধন্য করে তুলেছে।

পবিত্র স্থান গুলিতে পূজা অর্চনার পাশাপাশি মন্দিরের পরিবেশ, আশেপাশের পরিবেশ, আপনাকে মুগ্ধ করবেই। এই সমস্ত তীর্থস্থানে এক অলৌকিক শক্তি বিরাজ করছে, তার অনুভব করতে পারেন আপনি। সতী এবং ভৈরব যে এই সমস্ত পবিত্র স্থানে বিরাজ করেন তার অনুভব অনেকেরই হয়েছে।

এমন শক্তি পীঠে গিয়ে মনের ইচ্ছা জানিয়ে ভক্তি ভরে পূজা করলে জীবনের সকল দুঃখ-কষ্ট সরে গিয়ে মনের সকল ইচ্ছা পূর্ণ হয় সেটা অনেকেই বিশ্বাস করেন। স্থানীয় মানুষজন দের কাছে এই মন্দির অথবা শক্তি পীঠ একটি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র। এখানকার ঐশ্বরিক শক্তি তাদেরকে রক্ষা করছে প্রতিটি বিপদ থেকে। সতী মায়ের আশীর্বাদে সকলেই আছেন খুবই ভালো।

Leave a Comment