আলু চাষের পদ্ধতি, দারুন ফলন – Potato Cultivation Method in Bangla

আলু বিশ্বের অন্যতম প্রধান ফসল। উৎপাদনের দিকে থেকে ধান,গম ও ভুট্টার পরেই চতুর্থ স্থানে আছে আলু। আলু খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ফসল। প্রায় সর্বত্রই এর চাষ হয়ে থাকে। আলু সাধারনত সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। বিভিন্ন তরকারির সাথে খেতে খুবই মুখরোচক। আলু একটি স্টার্চ প্রধান খাদ্য এবং ভাতের বিকল্প হিসেবে খাওয়া যেতে পারে।  

আমাদের বাংলাভূমি সাইটে নিয়মিত আমরা আপনাদের সাথে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করে থাকি। এর ফলে আপনারা কৃষি জমি, শিক্ষা, অর্থনীতি এসব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে থাকেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রয়োজেনে আপনারা এ সকল  তথ্য থেকে উপকৃত হয়ে থাকেন।

এরই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা আপনাদের সাথে আলু চাষের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব। এতে করে আপনারা সহজেই আলু  চাষের বিস্তারিত জানতে পারবেন।

চলুন দেখে নেই আলু চাষের বিস্তারিতঃ 

মাটির ধরনঃ 

দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি আলুর জন্য সব চাইতে উপযোগী। এটেল দোআঁশ মাটিতে ও আলুর চাষ করা যায়। তবে এই রকম মাটিতে আলু খুব একটা ভালো হয় না। আলুর মাটি সুনিষ্কাশন যুক্ত, গভীর ও কিছুটা অম্লাত্নক হওয়া চাই। মাটির অম্লত্ব ৫.৫-৬ এর মধ্যে হওয়া বাঞ্ছনীয়। এত আলুর জন্য ক্ষতিকর রোগ স্কেভিস হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

বীজের হারঃ 

প্রতি হেক্টরে ১৫ টন। রোপণের দূরত্ব ৬০×২৫ সেমি এবং ৪৫×১৫ সেমি। 

বীজ শোধনঃ 

আলু বীজকে মারকিউরিক ক্লোরাইড এক গ্রাম নিয়ে ২ লিটার জলে মিশিয়ে ১-২ ঘন্টা ডুবিয়ে নিলে ভালো হয়। আবার বোরিক এসিডের ০.৫ % দ্রবণে আলু বীজ ১৫-৩০ মিনিট ডুবিয়ে রাখলে ও ভালো ফল পাওয়া যায়। কাটা বীজ বা গজানো বীজ শোধন করা যাবে না।

বীজ বপনঃ 

বপনের জন্য আলুর টিউবার অর্থাৎ কন্দ ব্যবহার করা হয়। আশ্বিনের মাঝামাঝি হতে অগ্রহায়নের মাঝামাঝি পর্যন্ত আলু লাগানো যেতে পারে। তবে আগাম ফসল করতে হলে ভাদ্র মাসের শেষে বীজ বপন করতে হবে।

আলু বীজ সারিতে বপন করতে হবে। এক সারি হতে অন্য সারির দূরত্ব ৬০ সেমি রাখতে হবে। এবং সারিতে এক বীজ থেকে অন্য বীজের দূরত্ব হবে ২৩-৩৮ সেমি। বীজ আস্ত বপন করাই ভালো। তবে আকারে বেশি বড় হলে কেটে দুই ভাগ করে লাগানো যায়। যে বীজের ব্যাস ২ হতে ৩ সেমি সেই বীজই বপনের জন্য উত্তম এবং সেসব বপন করার সময় কাটার প্রয়োজন হয় না।

আর যেসব বীজের ব্যাস এক সেমি চেয়ে বেশি সেগুলো কেটে লাগানো যেতে পারে। কেটে বপন করলে বীজের পরিমাণ কম লাগে অর্থাৎ আস্ত বীজ ব্যবহার করলে যদি এক প্রতি হেক্টরে ১৫০০ কেজি লাগে সেক্ষেত্রে কর্তিত বীজ ব্যবহার করলে এর অর্ধেক অর্থাৎ ৭৫০ কেজি বীজ লাগবে।

সারিতে বীজ বপনঃ 

সারিতে বীজ বপন দুই ভাবে করা যায়। 

প্রথম পদ্ধতিতে প্রতি সারি বরাবর ৫-৭ সেমি মাটি সরিয়ে নিলে নালা প্রস্তুত করা হয়, তারপরে সেই নালাতে নির্দিষ্ট দূরত্বে বীজ বপন করে মাটি দ্বারা বীজ ঢেকে দেওয়া হয়।

দ্বিতীয় পদ্ধতিতে সারির মাটি না খুড়ে অর্থাৎ নালা না করে সারির দাগ বরাবর বীজ নির্দিষ্ট ব্যবধানে বপন করার পর দুই সারির মধ্যবর্তী জায়গা হতে মাটি টেনে উuচু করে বীজ ঢেকে দেওয়া হয়।

সার প্রয়োগঃ 

আলুর উচ্চফলন পেতে সার প্রয়োগের বিকল্প নেই।

সাধারণত প্রতি হেক্টরে ২২০-২৫০ কেজি ইউরিয়া, ১২০-১৫০ কেজি টিএসপি, ২২০-২৫০কেজি এমওপি, ১০০-১২০ কেজি জিপসাম, ৮-১০ টন গোবর ইত্যাদি সার প্রয়োগ করা যেতে পারে। জমিতে যদি সবুজ সার প্রয়োগ করা হয় তাহলে গোবরের দরকার হয় না।

সার প্রয়োগ পদ্ধতিঃ 

গোবর, অর্ধেক ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও জিংক সালফেট আলু রোপনের আগেই মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া ৩০-৩৫ দিন পর  আলুর নালা তৈরি করে মাটি তোলার সময় দিতে হবে।

সেচ ব্যবস্থাপনাঃ 

আলুর জমিতে যদি অধিক সার ব্যবহার করা হয় তবে জমিতে পরিমান মতো জল ব্যবহার করতে হবে। আলুর জমিতে সেচ দেওয়া খুবই সুবিধাজনক। সারিতে গাছের গোড়ায় মাটি উচু করে দেওয়ার ফলে যে নালার সৃষ্টি হয় তার মধ্যে জল প্রবেশ করিয়ে দিলেই সারা ক্ষেত জলে সিক্ত হয়ে যায়। 

মাটির প্রকারভেদের উপর নির্ভর করে দুই থেকে তিন বার সেচ দিলেই চলবে। অধিক সেচ দেওয়া যাবে না । তাতে গাছে ছোট ছোট নিম্নমানের আলু ধরবে। আবার অনিয়মিত জল ব্যবহার করলে গুটি যুক্ত ফাপা ধরনের আলু জন্মাবার সম্ভাবনা থাকে। আলু উঠানোর দুই সপ্তাহ পূর্ব হতে সেচ বন্ধ করে দিতে হবে। এতে আলুর পূর্নতা প্রাপ্তি হবে।

আগাছা দমনঃ 

বীজ বপনের ৬০ দিন পর্যন্ত আলুর ক্ষেত আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। আলুর জমিতে আগাছা দমন আলাদা ভাবে করার প্রয়োজন পড়ে না। গাছের গোড়ায় মাটি তুলে দেওয় ও গোড়ার মাটি আলগা করে দেয়ার সময়ই আগাছা দমন হয়ে যায়।

গাছের গোড়ায় মাটি দেওয়াঃ 

জমিতে আলুর গাছ যখন ৫-৬ ইঞ্চি হবে তখন দুই সারির মাঝখানের মাটি হালকা ভাবে কুপিয়ে নরম ঝুরঝুরা করে নিতে হবে। মাটি ঠিকমতো না দিলে আলু বাইরে বের হয়ে যেতে পারে এবং সবুজ রং ধারন করে।

পরিপক্কতার লক্ষণঃ 

আলু গাছগুলো যখন হলুদ হওয়া শুরু করে মরে যাবে তখন আলু তোলার উপযুক্ত সময় হয়। সাধারণত আলু বীজ লাগাবার ৩ থেকে ৪ মাসের মধ্যেই আলু তোলা যায়।

ফসল সংগ্রহঃ  

আলুর সারিতে কোদালের সাহায্যে বা লাঙল চালিয়ে আলু মাটি থেকে তোলা হয়। তবে আলু তোলার সময় সতর্ক থাকতে হবে যাতে আলু কেটে বা থেতলিয়ে না যায়, কেননা আলু থেতলিয়ে গেলে সংরক্ষণ করার সময় পচে যাবে।

আজ আমরা আলু চাষ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলাম। আগামীতে আপনাদের সাথে আলু চাষ নিয়ে আরো কিছু আলোচনা করবো, তাই আমাদের পেজে নিয়মিত চোখ রাখুন। এই লেখাটি অনেকের কাজে লাগতে পারে তাই লেখাটি যতটুকু সম্ভব শেয়ার করুন। যাতে করে এই লেখা থেকে শিক্ষা নিয়ে আলু  চাষ করে অনেকেই আয় করার ব্যবস্থা করতে পারে।

Leave a Comment