পরশুরাম জয়ন্তী 2022: ইতিহাস ও তাৎপর্য | Parshuram Jayanti 2022: History and Significance

পরশুরাম জয়ন্তী 2022 (Parshuram Jayanti 2022 Date Time and Significance) 2022 পরশুরাম জয়ন্তীর ইতিহাস এবং জানুন পরশুরাম জয়ন্তী কেন পালন করা হয়? পরশুরাম জয়ন্তীর তাৎপর্য কি? ভারতীয়দের জন্য পরশুরাম জয়ন্তীর গুরুত্ব কতটা? জানুন সবকিছু এখানে।

বছর শুরুর আগের থেকে বিভিন্ন ধরনের উৎসবের মধ্য দিয়ে স্বাগত জানানো হয় নতুন বছরকে। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের যেন শেষ নেই। এমনই সব উৎসবের মধ্যে একটি জনপ্রিয় উৎসব হলো পরশুরাম জয়ন্তী।

অক্ষয় তৃতীয়ার দিন পালিত হয় পরশুরাম জয়ন্তী। আর এই দুটি উৎসব অর্থাৎ অক্ষয় তৃতীয়া এবং পরশুরাম জয়ন্তী বৈশাখ মাসের শুক্ল পক্ষের তৃতীয় দিনে পালিত হয়। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী বিষ্ণুর দশ অবতারের মধ্যে পরশুরাম হলো ষষ্ঠতম অবতার।

পরশুরাম জয়ন্তী ইতিহাস ও তাৎপর্য - Parshuram Jayanti History and Significance
পরশুরাম জয়ন্তী ইতিহাস ও তাৎপর্য – Parshuram Jayanti History and Significance

তাছাড়া অক্ষয় তৃতীয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরশুরাম জয়ন্তী ও পালন করা হয়। তার জন্ম চান্দ্র বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে হয়েছিল বলে এই দিনটি পরশুরাম জয়ন্তী নামে পরিচিত। আর এই দিনটি পরশুরাম জয়ন্তী হিসেবে পালন করা হয়।

অন্যান্য অবদানের মত পরশুরাম পূজিত হয় না, কারণ তাকে অমর বলে বিশ্বাস করা হয় কিন্তু পূরণের তথ্য অনুযায়ী যে ৮ জন পুরুষ অমরত্ব লাভ করেছেন, পরশুরাম হলেন তাদের মধ্যে একজন অন্যতম। বিষ্ণুর সব কটি অবতারের মধ্যে পরশুরাম এর অবতারই একমাত্র অমর।

বিষ্ণুর এই ষষ্ঠ অবতারের উদ্দেশ্য ছিল ধর্মহীন রাজাদের দূর করা, পাপী, ধ্বংসাত্মক রাজাদের দূর করা। যারা সম্পদ লুট করেছিল এবং রাজা হিসেবে তাদের দায়িত্ব পালন কখনোই করেননি। তাদেরকে বিনাশ করার জন্য পরশুরামের আবির্ভাব।

চলুন জেনে নেওয়া যাক, পরশুরাম জয়ন্তী তে পরশুরাম সম্পর্কিত কিছু তথ্য: 

পরশুরাম জয়ন্তীর ইতিহাস:

ভগবান বিষ্ণুর দশ অবতারের মধ্যে এটি ষষ্ঠতম অবতার সেটা আগেই বলা হয়েছে। তার নিঃস্বার্থ তপস্যার জন্য মহাদেব নিজে প্রসন্ন হয়ে তাকে একটি কুঠার দিয়েছিলেন বর হিসাবে। বিশ্বাস করা হয় যে ভগবান শিব পরশুরামকে যুদ্ধ শিল্প শিখিয়েছিলেন। হিন্দু পুরান মতে পরশুরাম হলেন সেই ব্যক্তি যিনি মহাভারতের বিখ্যাত সব বীর চরিত্র দের যেমন ধরুন:- ভীষ্ম, দ্রোণাচার্য, এমনকি কর্ন কেও অস্ত্রবিদ্যা শিখিয়েছিলেন।

পরশুরাম এর পরিবার সম্পর্কে যেটুকু জানা যায় তাতে পরশুরাম এর পিতা হলেন জগদগ্নী, তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণ এবং মাতা রেনুকা ছিলেন ক্ষত্রিয় কন্যা। তাই পরশুরাম জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণ হলেও তিনি ছিলেন ক্ষত্রিয় তেজ সম্পন্ন অর্থাৎ যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী। এখনো পর্যন্ত বিশ্বাস করা হয় যে পরশুরাম বিশ্বে কোথাও না কোথাও বেঁচে রয়েছে। হিন্দু পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী পরশুরাম যেহেতু অমর।

আর এই বিশ্বাসের উপরে নির্ভর করে তার অমর হওয়ার কারণে ভগবান রাম, শ্রী কৃষ্ণ, এবং অন্যান্য দেব দেবীর মতো পরশুরামের পূজা করা হয় না। পুরান মতে পরশুরাম এর সঙ্গে সুরভী নামে এক গাভীর অধিকার নিয়ে কার্তবিরজা অর্জুন নামে এক মহা পরাক্রমশালী ক্ষত্রিয় রাজার তীব্র যুদ্ধ হয়।

সেই ক্ষত্রিয় রাজাকে পরাজিত করেন এবং হত্যা করেন। কিন্তু রাজন্য হত্যার পাপ তার উপরে এসে পড়ে। আর পিতা জমদগনির নির্দেশে তিনি পাপ ক্ষয়ের জন্য তীর্থ ভ্রমণে বের হয়ে যান।

অন্যদিকে কার্যবিরজার্যুন এর হত্যার প্রতিশোধ নিতে ক্ষতীয় রাজারা সবাই একত্র হন এবং পরশুরামের অনুপস্থিতিতে জমজগ্নিকে হত্যা করেন অর্থাৎ পরশুরামের পিতা কে হত্যা করা হয়।

সেই সময় ক্রুদ্ধ পরশুরাম ২১ বার পৃথিবীকে একা হাতে ক্ষত্রিয় শূন্য করেন। পরে তার মনে একটু শান্ত ভাব আসলে তিনি প্রব্রজ্জা গ্রহণ করেন। এছাড়া বেদি ভাগবত, বায়ু পুরাণ, বিষ্ণুপুরাণ এ পরশুরাম এর জন্ম সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।

মহাভারতে পরশুরামকে উগ্র তেজা মহাপ্রতি ব্রাহ্মণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কোন কোন জায়গায় তাকে পিতার আদেশে মাতৃ হত্যা করতেও দেখা যায়। যদিও রেনুকাকে পুনর্জীবিত করেন তবুও সেই মাতৃহত্যার পাপে তার কুঠার রক্তে রাঙা থেকেই যায়। তাই তার প্রতিটি ছবিতে তার কুঠারে রক্তের চিহ্ন থাকে। ধুয়ে ধুয়েও তা থেকে মাতৃ রক্ত মুছে ফেলা যায়নি এমনটাই জানা যায়।

তারপর অবশেষে কর্নাটকে তুঙ্গ নদীর জলে স্নান করে সেই কুঠার ধোয়ার পর কুঠারটি অভিশাপ মুক্ত হয়। হিন্দু পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে সংসারে বিষ্ণু যে অবতার লাভ করেছেন পরশুরাম তাদের মধ্যে অন্যতম, আর বিষ্ণুর অবতারদের মধ্যে তিনিই একমাত্র অমর হিসাবে রয়েছেন। এখনো বিশ্বাস করা হয় যে ব্রহ্ম ক্ষত্রিয় পরশুরাম কল্কি অবতারকে অস্ত্রশিক্ষা দেবেন বলেই জীবিত রয়েছেন এখনও।

তবে পুরান অনুযায়ী জানা যায় যে, ধর্ম রক্ষা করতে শ্রীকৃষ্ণকে সুদর্শন চক্র দান করেছিলেন স্বয়ং পরশুরাম। এ কথা জানা ছিল কি ?  সত্য যুগ থেকে শুরু করে ত্রেতা ও দ্বাপর যুগে ও পরশুরাম এর উপস্থিতি কাহিনী তে পাওয়া যায়। ত্রেতা যুগে সীতার স্বয়ংবর সভায় যখন রাম হরধনু ভঙ্গ করে ফেলেন তখন রুষ্ট হয়ে তাকে শাস্তি দিতে মহেন্দ্র পর্বত থেকে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন পরশুরাম।

কিন্তু বিষ্ণুর এই এক অবতার রামের আসল প্রকৃতি জানতে পেয়ে তাকে সম্মান করেন। পরশুরাম সেই সময়ে রাম কে সুদর্শন চক্রটি গচ্ছিত রাখার কথা বলেন। তিনি বলেন যে দ্বাপর যুগে তিনি যখন আবার জন্ম নেবেন তখন যেন পরশুরাম সেটি ফিরিয়ে দেন। দ্বাপর যুগে অবতীর্ণ হলে ধর্ম রক্ষা করার জন্য শ্রীকৃষ্ণ কে সুদর্শন চক্রটি ফিরিয়ে দেন পরশুরাম।

বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম এবং সপ্তম অবতার রামের জন্ম হয় পরশুরামের মৃত্যুর পূর্বেই। রামচন্দ্র হরধনু ভঙ্গের পর সীতার সাথে অযোধ্যায় ফিরে আসছিলেন। রেগে গিয়ে রামের মুখোমুখি হন এবং অহংকার এর সঙ্গে বলেন তার কাছে বৈষ্ণব ধনু আছে।

আর সেই বৈষ্ণব ধনু ভঙ্গ করে প্রকৃত বীরত্ব দেখানোর জন্য তিনি রামচন্দ্রকে আহ্বান জানিয়েছিলেন, আর রাম যদি এতে ব্যর্থ হন তাহলে তাকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হবে বলে যুদ্ধে আহ্বান করেন পরশুরাম।

বৈষ্ণব ধনু নিয়ে পরশুরাম এর  সমস্ত শক্তি বিনষ্ট করেন রাম। তার ফলে পরশুরাম এর তেজ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। আর তিনি নির্বীর্য হয়ে রামচন্দ্রকে পূজা করেন এবং প্রদক্ষিণ করে মহেন্দ্র পর্বতে ফিরে যান।

তো এই ছিল বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরামের কাহিনী। যা আজও অক্ষয় তৃতীয়ার দিন পরশুরাম জয়ন্তী হিসেবে পালন করা হয়। তিনি অমর বলে তার পূজা অর্চনা করা হয় না বলে জানা গিয়েছে। তবে অনেক জায়গায় পরশুরাম জয়ন্তীর দিন টি তার জন্মদিন হিসেবে উদযাপন করা হয়।

Leave a Comment