পেঁপে চাষের সহজ ও সঠিক পদ্ধতি – Papaya Cultivation Method in Bangla

পেঁপে আমাদের গ্রাম বাংলার প্রতিটি বাড়িরই একটি পরিচিত ফল। খুব সহজেই এবং অল্প সময়ে ফল আসায় পেঁপে গাছ মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। পেঁপে কাঁচা ও পাকা উভয়ভাবেই খাওয়া যায় বলে এর চাহিদা সবসময়ই বেশি থাকে।

পেঁপে কাঁচা অবস্থায় তরকারী হিসেবে খাওয়া হয়, আবার পাকা পেপে ফল হিসেবে খাওয়া হয়। পেঁপের এত গুন থাকায় এটি শুধুমাত্র শৌখিনভাবে নয়, বানিজ্যিকভাবেও পেঁপের চাষ করা খুবই লাভজনক। পেঁপে গাছ লম্বা হয়ে থাকে। বোঁটাযুক্ত ছত্রাকার পাতা বেশ বড় হয় ও সর্পিল আকারে কাণ্ডের উপরাংশে সজ্জিত থাকে। এ গাছ লম্বায় প্রায় তিন থেকে সাত ফুট লম্বা হয়ে থাকে। পেঁপে গাছ কম-বেশি সারা বছর ফল দিয়ে থাকে। 

আমাদের বাংলাভূমি সাইটে নিয়মিতভাবে আমরা আপনাদের সাথে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করে থাকি। এর ফলে আপনারা জমি, শিক্ষা, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞানলাভ করে থাকেন। জীবনের নানা প্রয়োজনের সময়ে এসকল তথ্য থেকে উপকৃত হয়ে থাকেন।

এরই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা আপনাদের সাথে পেঁপে চাষ পদ্ধতি ও রোগ বালাই প্রতিরোধ  নিয়ে আলোচনা করবো। এতে করে আপনারা সহজেই পেঁপে চাষ নিয়ে বিস্তারিত জানতে পারবেন। এতে করে আপনারা সহজেই নিজের বাড়িতে পেঁপে চাষ করে পারিবারিক চাহিদা মেটাতে পারবেন। 

আসুন আমরা জেনে নিই পেঁপে চাষ নিয়ে বিস্তারিত

মাটি ও জমি নির্বাচন

পেঁপে গাছ উঁচু জায়গায় ও জল নিষ্কাশনের ভালো বন্দোবস্ত আছে এমন জমিতে পেঁপে চাষ করতে হবে।

কারণ কয়েক ঘণ্টা জল থাকা অবস্থাও পেঁপে গাছ সহ্য করতে পারে না। বেলে দোঁয়াশ বা দোঁয়াশ মাটি ভাল। অধিক অম্ল ও অধিক ক্ষার মাটিতে পেঁপে চাষ ভাল হয় না।

চারা তৈরি করা

পেঁপে বীজ থেকে চারা হয়। ভালো মানের পাকা পেঁপে থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হবে। বীজ সংগ্রহের পর শুকিয়ে নিতে হবে। এরপর  ১ দিন ভিজিয়ে রেখে পেঁপে বীজ শুকনো গোবর ও ছাই দিয়ে রোপন করতে হবে।

বীজের উপর ধানের কুড়া দিয়ে ঢেকে দিতে হবে এবং উপরে জল ছিটিয়ে দিতে হবে। ১০-১২ দিন পর চারা গজিয়ে থাকে। চারা গজালে ঢেকে রাখা ধানের কুড়া সরিয়ে দিতে হবে। 

চারা রোপন পদ্ধতি

চারা রোপনের জন্য 60X60X45 সেন্টিমিটার আকারে গর্ত করতে হবে। গর্তের দূরুত্ব হবে ২ মিটার। গর্তে গোবর সার ও টিএসপি সার দিয়ে মাটির সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে নিতে হবে। এখানে দেড় থেকে ২ মাস বয়সের চারা রোপন করতে হবে।

প্রতিটি গর্তে ৩ টি করে গাছ লাগান এবং ৫-৬ মাস পরে পুরুষ কাছগুলি দেখে কেটে ফেলুন। তবে প্রতি ১০ টি গাছের জন্য ১টি পুরুষ গাছ রাখা দরকার। এতে করে পরাগায়নের সুবিধা হয় এবং ফলন ভালো হয়। 

পেঁপে গাছে সার প্রয়োগ

প্রতিটি পেঁপে গাছে ১৫ কেজী করে জৈব সার, ৫০০ গ্রাম ইউরিয়া সার, ৫০০ গ্রাম টিএসপি এবং ২০ গ্রাম জিংক সালফেট সার একত্রে প্রয়োগ করতে হবে।

চারা লাগানোর পর গাছে নতুন পাতা গজালে ইউরিয়া ও এমওপি সার ৫০ গ্রাম করে প্রয়োগ করতে হয়। গাছে ফুল আসলে সারের পরিমান দ্বিগুন করতে হবে। 

পরিচর্যা

পেঁপে গাছে নিয়মিতভাবে জল দিতে হবে । আবার জল যাতে না দাঁড়ায়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। তা নাহলে পেঁপে গাছ মরে যাবে। লক্ষ্য রাখতে হবে পেঁপে গাছের গোড়ায় আগাছা যেন না হয়।

গোড়ার মাটি হালকা করে খুঁড়ে খুঁড়ে ঝুরঝুরে করে দিতে হবে। স্ত্রী ফুল বাড়াতে পেঁপে গাছের ৪-৫ মাস বয়সে ইথারেল ১ মিলি প্রতি ৪ লিটার জলে গুলে স্প্রে করতে হবে। এনএএ ৪০ এমজি প্রতি লিটার জলে গুলে স্প্রে করলেও স্ত্রী ফুল বাড়ে। 

পেঁপের চারা-ধসা রোগ

এ রোগে আক্রান্ত পেঁপে গাছের চারার গোড়ার চারদিকে এক ধরনের দাগ দেখা যায়। এতে গাছের শিকড় পচে যায়, চারা নেতিয়ে পড়ে, সবশেষে গাছটি মারা যায়।

মাটি স্যাতস্যাতে ও মাটির উপরিভাগ শক্ত হলে এ রোগের প্রকোপ বাড়তে দেখা দেয়। এ রোগটি মাটিবাহিত বিধায় মাটি, আক্রান্ত চারা ও জলের মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে থাকে। এজন্য পেঁপে গাছের গোড়ায় জল নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। আক্রান্ত চারা বীজতলা থেকে দ্রুত অপসারণ করতে হবে।

এ রোগ ঠেকাতে চারা রোপণের আগে ছত্রাকনাশক মিশিয়ে ১৫ থেকে ২০ মিনিট বীজশোধন করে নিতে হবে। রৌদ্রযুক্ত উঁচু স্থানে বীজতলা তৈরি করে নিলে সবচেয়ে ভালো হয়।

পেঁপে গাছের গোড়ায় পচা রোগ

পেঁপে গাছ গোড়ায় পচা রোগে আক্রান্ত হলে গাছের পাতা হলুদ হতে থাকে।একসময় চারার গোড়া ও শিকড় পচে যায়। চারা নেতিয়ে পড়ে গাছটি মারা যায়।

এক্ষেত্রে আক্রান্ত গাছ অপসারণ করতে হবে। এ রোগ ঠেকাতে ছত্রাকনাশক ওষুধ জলে মিশিয়ে গোড়ার মাটিসহ ভিজিয়ে দিতে হবে। তবে সাবধান, আক্রান্ত গাছের বীজ সংগ্রহ করা যাবে না। 

পাতা কুঁচকানো রোগ

পেঁপে গাছের এক ধরনের ভাইরাসের কারণে পেঁপের পাতা কুঁচকানো রোগ দেখা দেয়। এ রোগ হলে গাছে কুঁচকানো ও কোঁকড়ানো পাতা দেখা দেয়। এতে করে পেঁপে গাছের বৃদ্ধি থেমে যায়।

এক সময় বাগানে এ গাছ জঙ্গল হিসেবে পরিগণিত হয়। এক্ষেত্রে বাগান থেকে আক্রান্ত গাছ তুলে ফেলাই উত্তম। প্রথম অবস্থায় যত দ্রুত সম্ভব কৃষি অধিদফতরের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ দিতে হবে।

ফল সংগ্রহ

পেঁপে গাছ শীতকালে রোপন করা হলে ৪-৫ মাস পর গাছে ফুল আসে। তার ১-২ মাস পর থেকে কাচা পেঁপে সবজি হিসেবে খাওয়া যায়।

প্রথমদিকে অনেক পেঁপে আসায় কিছু পেঁপে কেটে দিতে হবে এতে করে অন্য পেঁপেগুলো বড় হবার সুযোগ পায়। আরো ৩-৪ মাস পর থেকে গাছে পেঁপে পাকতে শুরু করে। পেঁপে হলুদ রঙের হলেই পাকা পেঁপে সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। 

আজ আমরা আপনাদের সাথে পেঁপে চাষের সুবিধাগুলি আলোচনা করলাম। আগামীতে আপনাদের সাথে এই পেঁপে চাষ নিয়ে আরো কিছু আলোচনা করবো, তাই আমাদের পেজে নিয়মিত চোখ রাখুন।

এই লেখাটি অনেকের কাজে লাগতে পারে তাই লেখাটি যতটুকু সম্ভব শেয়ার করুন, যাতে করে অনেকে এই লেখা থেকে শিক্ষা নিয়ে পেঁপে চাষ করে আয় করার ব্যবস্থা করতে পারে। 

Leave a Comment