নরসিংহ জয়ন্তী 2022: ইতিহাস ও তাৎপর্য | Narasimha Jayanti 2022: History and Significance

নরসিংহ জয়ন্তী 2022 (Narasimha Jayanti 2022 Date Time and Significance) 2022 নরসিংহ জয়ন্তীর ইতিহাস এবং জানুন নরসিংহ জয়ন্তী কেন পালন করা হয়? নরসিংহ জয়ন্তীর তাৎপর্য কি? ভারতীয়দের জন্য নরসিংহ জয়ন্তীর গুরুত্ব কতটা? জানুন সবকিছু এখানে।

হিন্দু ধর্মে বিভিন্ন দেবদেবীর মধ্যে নরসিংহ পূজা একটি বিশেষ পূজা বলে মনে করা হয়। এই দিনে ভগবান নরসিংহ ও দেবী লক্ষীর মূর্তি অথবা ছবিতে বিশেষভাবে পূজার আয়োজন করা হয়। তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে স্নান সেরে এই পূজা করতে হয়। নরসিংহ হলো বিষ্ণুর একটি রূপ, যেটা আমরা কমবেশি সকলেই জানি।

হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে একাধিক দেব-দেবীর উল্লেখ রয়েছে আর তাদের মধ্যে আদি দেবতা হলেন বিষ্ণু, শাস্ত্র মতে ব্রহ্মা-বিষ্ণু- মহেশ্বর হল তিন শক্তি। মহাজাগতিক সকল শক্তির উৎস হলেন তারা।

নরসিংহ জয়ন্তী ইতিহাস ও তাৎপর্য - Narasimha Jayanti History and Significance
নরসিংহ জয়ন্তী ইতিহাস ও তাৎপর্য – Narasimha Jayanti History and Significance

সেই কারণে একাধিক দিন উৎসর্গ করা হয় আলাদা আলাদা দেব দেবীদের নামে। তেমনি একটি উৎসবের দিন হলো নরসিংহ জয়ন্তী, যেদিন বিষ্ণুর একটি অবতার কে পূজা করা হয়।

সংস্কৃত শব্দ নরসিংহ দুটি শব্দ নিয়ে গঠিত নর অর্থাৎ মানুষ এবং সিংহ যার অর্থ হল সিংহ একসাথে এই শব্দটির অর্থ মানুষ সিংহ। বিষ্ণুর মিশ্র  এই অবতার কে এই নরসিংহ বলে বোঝানো হয়।

তাছাড়া হিন্দুদের কাছে নরসিংহ জয়ন্তী হল অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। বৈশাখ মাসে শুক্ল পক্ষের বৈশাখী চতুর্দশীতে পালন করা হয় নরসিংহ জয়ন্তী। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে নরসিংহ হলেন বিষ্ণুর চতুর্থ অবতার।

তিনি নরসিংহের রূপ ধারণ করে মর্ত্যে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এছাড়া পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে তার মুখ ছিল সম্পূর্ণ সিংহের মত দেখতে, এবং সম্পূর্ণ শরীর ছিল মানুষের মত। তাছাড়া এই রূপ ধারণ করে তিনি অসুর হীরান্যকশিপু কে বধ করেছিলেন বলে জানা যায়।

এই দিন নরসিংহ জয়ন্তী উপলক্ষে ভক্তরা, বিশেষ করে বিষ্ণুর ভক্তরা সারাদিন উপবাস পালন করে থাকেন। এছাড়া বিশ্বাস করা হয় যে, এই চতুর্দশীকে সূর্যাস্তের সময় তিনি আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং সেই কারণে সেই সময় গুলিতে বিশেষভাবে পূজা অর্চনা করা হয়। যার ফলে অধর্ম কে দূরে রেখে ধর্মের পথে চলা সম্ভব হয়ে ওঠে, জনসাধারণের সঠিক কাজ করা এবং অন্য কারো ক্ষতি না করাই হলো নরসিংহ জয়ন্তীর মূল উদ্দেশ্য।

নরসিংহ জয়ন্তীতে উপবাসের নিয়ম এবং আচার বিধি: 

নরসিংহ জয়ন্তীতে উপবাসের আচরণ ও নিয়ম হল অনেকটা একাদশীর মতো। ভক্তরা নরসিংহ জয়ন্তীর আগের দিন একবার মাত্র খেয়ে থাকেন। প্রথাগত ভাবে ভক্তরা চাল, গম, এর খাবার এড়িয়ে চলেন এবং অন্য ফল আহার করে থাকেন।

নরসিংহ জয়ন্তীতে বিষ্ণুর ভক্তরা বিকেলে সংকল্প গ্রহণ করে তারপরে সন্ধ্যার সময় নরসিংহ পুজো করেন। অনেকে আবার সূর্যাস্তের আগে পুজো দিয়ে থাকেন, কেননা এই সময় নরসিংহ আবির্ভূত হয়েছিলেন বলে ধারণা করা হয়। নরসিংহ পূজার পরের দিন উপবাস শেষ হয় এবং দরিদ্রদের মধ্যে খাবার প্রদান করা হয়ে থাকে।

নরসিংহ জয়ন্তীতে নরসিংহ পুজোর বিধি ও তাৎপর্য: 

এদিন সকালে স্নান সেরে, পরিষ্কার জামা কাপড় পড়তে হয়। তারপর মা লক্ষ্মী ও নরসিংহ মূর্তিতে পূজা করা হয়। মিষ্টি, নারকেল, ফল, কেশর, নিবেদন করা হয়। এদিন উপবাস করে থাকেন অনেকেই।

উপবাস নরসিংহ জয়ন্তীতে শুরু হয় এবং পরের দিন সকালে সূর্য ওঠা পর্যন্ত উপবাস করে থাকতে হয়। অন্যান্য শস্যদানার খাবার খাওয়া যাবে না। তাছাড়া এই দিনে গরীব দুঃখীদের পোশাক, খাদ্য, তিল, দামি ধাতু, দান করতে পারেন। যার ফলে আপনার সংসারে উন্নতি ও সুখ সমৃদ্ধি বজায় থাকবে।

ফুল, ফল, মিষ্টি, কুমকুম, কেসর এর মত জিনিসপত্রের সাথে সাথে ছোলা, ডাল ও গুড়ের নৈবেদ্য দিয়ে পূজা করতে হয়, ও পুজোর সুফল পেতে রুদ্রাক্ষের মালা দিয়ে নরসিংহ মন্ত্র পাঠ করা শুভ বলে মনে করা হয়। তাছাড়া সমস্ত রকম সমস্যা দূর করার জন্য মন, প্রাণ ও ধ্যান দিয়ে নরসিংহ জয়ন্তী উদযাপনের সাথে সাথে পূজা-অর্চনা করলে সমস্ত সমস্যার সমাধান হয় বলে ধারণা করা হয়।

হিন্দু শাস্ত্র অনুসারে অশুভ শক্তিকে নাশ করতে নরসিংহ অবতারের আবির্ভূত হয়েছিলেন বিষ্ণু, তাই নরসিংহ জয়ন্তীর দিন উপবাস করে পূজা করলে সকল কাজের সফল হওয়া যায়। জীবনের সমস্ত রকম জটিলতা কাটিয়ে নিজের লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়, এই নরসিংহ জয়ন্তী উদযাপনের মধ্যে দিয়ে।

নরসিংহ জয়ন্তীর ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনী: 

প্রতিটি উৎসবের পিছনে কোন না কোন পৌরাণিক ঘটনা রয়েছেই, যা জানলে ভক্তি, শ্রদ্ধা অনেক গুণ বেড়ে যায়। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে ঋষি কাশ্যপ ও তার স্ত্রী দিতির দুই সন্তান ছিল। তাদের নাম হিরণ্যশিপুহিরন্যাক্ষ। দুই ভাই ভগবান ব্রম্ভাকে সন্তুষ্ট করার জন্য কঠোর তপস্যা শুরু করেন। ব্রহ্মা সন্তুষ্ট হয়ে তাদের এমন বর দেন যে, দেখা যায় পৃথিবীর কোন জীব, অস্ত্র এমন কি দেবতারা ও তাদের হত্যা করতে পারবেন না।

এমন বর পেয়ে তারা অবিচারে হত্যা করতে থাকে, এমন অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অবশেষে বিষ্ণু বরাহ অবতার ধারণ করে হত্যা করেন হিরন্যাক্ষ কে। তারপর নরসিংহ অবতার নিয়ে হীরান্যকশিপুকে হত্যা করেন। আর সেই থেকেই পালিত হয়ে আসছে নরসিংহ জয়ন্তী উৎসব।

শাস্ত্রমতে অত্যাচারী হিরণ্যশিপুকে বধ করতে মর্ত্যে এসেছিলেন বিষ্ণু। আর সেই কারণে এই দিনে নিষ্ঠাভরে শ্রী বিষ্ণুর পূজা করলে সমস্ত রকম অশুভ শক্তি, জটিলতা, সমস্যা, দূর হয়ে সফলতার দেখা পাওয়া যায়।

সমগ্র ভারতের সাথে সাথে দক্ষিণ ভারতে নরসিংহের অনেক মন্দির চোখে পড়ে। যেখানে নিয়মিত রূপে নরসিংহের পূজা করা হয়। তাছাড়া এমন অনেক বনেদি বাড়ি বা অনেক গৃহস্থের বাড়িতে নরসিংহ মূর্তিতে এবং লক্ষ্মীর মূর্তিতে পূজা অর্চনা করা হয়।

উপবাস থাকার সাথে সাথে এই দিন বিভিন্ন রকমের নৈবেদ্য দিয়ে নরসিংহ উৎসব অথবা পূজা করা হয়। বিষ্ণুর ভক্তরা সংসারে উন্নতি, সমস্ত কাজে সফলতা পাওয়ার জন্য, ব্যবসায় উন্নতি, ধন সম্পদ বৃদ্ধির জন্য নরসিংহ জয়ন্তী পালন করে থাকেন।

এই দিন নরসিংহের মূর্তি পূজা দেওয়ার পাশাপাশি ধনসম্পদের দেবী লক্ষ্মী দেবীকেও পূজা করা হয়। ভক্তিতে থাকে শক্তি, তাই যদি ভক্তি ভরে, নিষ্ঠা ভরে পূজা করা যায় তাহলে কিন্তু সমস্ত বাধা বিপদ কাটিয়ে জীবনকে আরো বেশি সুন্দর ও সহজ করে তোলা যায়।

Leave a Comment