কামগিরি শক্তিপীঠ: যে স্থানে সতীর যোনি পতিত হয়েছিল, আজানা ইতিহাস জানুন

(Kamgiri Shakti Peeth in Bengali) কামগিরি শক্তিপীঠের বর্তমান অবস্থান কোন স্থানে? দেবী সতীর কোন অঙ্গ এখানে পতিত হয়েছে? কামগিরি শক্তিপীঠের পৌরাণিক কাহিনী কি? কিভাবে আরাধনা করা হয়? এই মন্দিরের তাৎপর্য কি? জানুন সবকিছু বিস্তারিত।

সতীর দেহ অংশ ৫১ টি খন্ডে বিভক্ত হয়ে এই ধরনীর বুকে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে।  সেখানে একটি করে শক্তিপীঠ অথবা সতী পীঠ গড়ে উঠেছে। যেগুলি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র তীর্থস্থানে পরিণত হয়েছে। আর এই কামগিরি শক্তিপীঠ অথবা কামাক্ষ্যা মন্দির যেখানে অবস্থিত সেখানে দেবী সতীর যোনি পতিত হয়েছিল।

এই কারণে এই শক্তি পীঠকে যোনিপীঠ” ও বলা হয়। এই মন্দির চত্বরে দশমহাবিদ্যা অর্থাৎ ১) ভুবেনেশ্বরী, ২) ছিন্নমস্তা, ৩) বগলামুখী, ৪) তারা, ৫) কালি, ৬) ত্রিপুরা সুন্দরী, ৭) ভৈরবী, ৮) মাতঙ্গী, ৯) ধূমাবতি ও ১০) দেবী কমলা, এই দশ দেবীর মন্দিরও রয়েছে।

Kamgiri Shakti Peeth in Bengali - কামগিরি শক্তিপীঠ
Kamgiri Shakti Peeth in Bengali – কামগিরি শক্তিপীঠ

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, যখন সতীর যোনি কামরূপে নীলগিরি পর্বতে পতিত হয়েছিল তখন তার ভার সহ্য করতে না পেরে কম্পিত পর্বত ক্রমশ পাতালে প্রবেশ করতে থাকে। তখন মা কামাক্ষ্যা সেই ভার বহনের দায়িত্ব নেন। বলা হয় যে, যে স্থানে যোনিদেশটি পড়েছিল  তার নাম কুব্জিকা, বর্তমানে সেই জায়গাটি কামাখ্যা নামে পরিচিত।

কামগিরি শক্তিপীঠ:

শক্তিপীঠের নাম কামগিরি শক্তিপীঠ
স্থান কামগিরি, কামাখ্যা, নীলাচল পর্বত, গৌহাটি, আসাম
দেশ ভারত
দেবীর অংশ যোনি
শক্তির নাম কামাখ্যা

কামাখ্যা মন্দিরের ভৌগলিক গুরুত্ব:

কামাখ্যা মন্দির ভারতের আসাম রাজ্যের গুয়াহাটি শহরের পশ্চিম অংশে নীলাচল পর্বতে অবস্থিত। হিন্দু দেবী কামাখ্যার একটি মন্দির, এটি ৫১ টি শক্তি পীঠের মধ্যে অন্যতম একটি শক্তিপীঠ। যেখানে এই কামাখ্যা মন্দিরটি অবস্থিত, সেখানে সতীর গর্ভ ও যোনি এসে পড়েছিল। আর এই ভাবেই কামাখ্যা কে উর্বরতার দেবী অথবা “রক্তক্ষরণকারী দেবী” বলা হয়। এই মন্দির চত্বরে দশমহাবিদ্যার মন্দিরও বিরাজমান।

এই মন্দিরগুলোতে ৩০ টি দেবীর মন্দির ও রয়েছে, সেগুলি হল:-  ১) ষোড়শী অথবা ললিতা, ২) ত্রিপুর সুন্দরী, ৩)  ভুবনেশ্বরী অথবা জগদ্ধাত্রী, ৪)  কামাখ্যা, ৫) শৈলপূত্রী, ৬)  ব্রহ্মচারীনি অথবা তপস্যা চারিণী, ৭) কুষ্মাণ্ডা, ৮) মঙ্গলচন্ডী ৯) মহা গৌরী, ১০) কৌশিকী, ১১) চামুন্ডা, ১২) দাক্ষায়নী সতী, ১৩) চন্দ্র ঘন্টা, ১৪) কালরাত্রি, ১৫)  স্কন্দ মাতা, ১৬)  কাত্যায়নী ১৭) সিদ্ধিদাত্রী ১৮) শকম্ভারী, ১৯) হৈমববতী, ২০) সংকটনাশিনী, ২১) শীতলা, ২২) বনচন্ডী, ২৩) মহাভৈরবী, ২৪) দেবী দুর্গা, ২৫) ধুমাবতী, ২৬) ছিন্নমস্তা, ২৭) বগলামুখী, ২৮) মাতঙ্গী, ২৯) দেবী কমলা, ৩০) মহাকালী তারা।

এই মন্দির অসমের রাজধানী গুয়াহাটি থেকে খুবই কাছাকাছি ব্রহ্মপুত্র নদের গা ঘেঁষে নীলাচল পাহাড়ের ধারে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। ভক্তদের বিশ্বাস অনুসারে মনে করা হয় যে, এখানে দেবাদিদেব মহাদেব সবসময় পার্বতীর সাথে বসবাস করেন। আর এই মহাপীঠ অতি গোপনীয় বলেও উল্লেখ করা আছে অনেক জায়গায়।

ভক্তদের বিশ্বাস অনুসারে এই যোনিপীঠ দর্শন, স্পর্শ এবং জল স্বরূপ পান করলে মানুষ সমস্ত রকম ঋণ থেকে মুক্ত হতে পারেন। এর পাশাপাশি এই স্থানে মহামায়া কুমারী রূপে পূজিতা হয়ে থাকেন। আর বিশ্বাস অনুসারে জানা যায় যে, এখানে দেবী সাধারণ নারীর মতোই ঋতুমতি হন।

এরমধ্যে ত্রিপুরা সুন্দরী, মাতঙ্গী এবং দেবী কমলা প্রধান মন্দিরে পূজিত হয়ে থাকেন। অন্যান্য দেবীদের জন্য পৃথক পৃথক মন্দির রয়েছে। হিন্দুদের জন্য বিশেষ করে তন্ত্রসাধকদের কাছে এই মন্দির অন্যতম প্রাচীন এবং একটি পবিত্র তীর্থক্ষেত্র।

কামগিরি শক্তিপীঠ অথবা কামাখ্যা মন্দিরের পৌরাণিক কাহিনী:

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, অসুর রাজ নরকাসুর শিকারে বেরিয়ে একদিন সন্ধ্যায় কামাখ্যা দেবীর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিবাহ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কামাখ্যা দেবী তাতে সম্মতি দেন। কিন্তু তিনি শর্ত রাখেন যে, ওই নীলগিরির সঙ্গে অর্থাৎ কামরূপের নীলপর্বত এ অবতরণের জন্য চারদিক দিয়ে চারটি সিড়িসহ ওই পাহাড়ে একটি বিশ্রামাগার গড়ে দিতে হবে এবং এই কাজ আগামী সূর্যোদয়ের আগেই করতে হবে।

এমন শর্তে রাজি হয়ে অসুর রাজ সৈন্য সামন্ত নিয়ে সব কাজ সম্পন্ন করলেন। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে কামাখ্যা দেবী একটি মায়াবী মোরগ সৃষ্টি করে রাত সমাপ্ত হয়েছে এমন ঘোষণা করলেন। নরকাসুর রাত শেষ হয়ে গেছে ভেবে কাজে বিরতি দিলেন।

পরে আসল কথা জানতে পেরে খুবই রেগে যান নরকাসুর, তারপর সেই মোরগকে বধ করেন। পরবর্তীতে শ্রীকৃষ্ণের সাহায্যে কামাখ্যা নরকাসুরকে বধ করেন। সেই অনুযায়ী নরকাসুরই এই কামাখ্যা মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা বলাই যায়, তাই না ! অন্য মতে কামাখ্যা মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা কামদেব।

আরেকটি বর্ণনা অনুযায়ী জানা যায় যে, কোচবিহারের বিশ্বসিংহ স্বপ্নে আদেশ পেয়ে কামরূপে নীলপর্বতে অবস্থিত কামাখ্যা মন্দির পুনর্নির্মাণ করে পূজা আরম্ভ করেন। একসময় তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা রাজাদের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে পথ হারিয়ে এই নীল পর্বতের নিচে উপস্থিত হন। কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, দেবী স্বয়ং বৃদ্ধার ছদ্মবেশে রাজা কে পূজার কথা বলেন। দেবী জানিয়েছিলেন এখানে পূজা দিলে রাজার সকল মনোকামনা পূর্ণ হবে।

দেবীর আশীর্বাদে তিনি যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর পন্ডিত দের পরামর্শে তিনি ওই জায়গায় মন্দির নির্মাণ করেন। পরবর্তীকালে রাজা নরনারায়ন এই মন্দিরের পুনঃ নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি শুনেছিলেন যে সন্ধ্যা বেলায় পূজার সময়ে কামাখ্যা দেবী নাকি দর্শন দেন।

তিনি পূজার সময় দেবীর দর্শন লাভের আশায় আসেন, পূজার সময় প্রচন্ড আলোয় তার চোখ ঝলসে যায় এবং দেবী তাকে অভিশাপ দেন যে, যদি রাজা বা তার পরিবারের কেউ আবার এই মন্দিরের কাছে আসেন তাহলে তাদের বংশ ধ্বংস হয়ে যাবে। সেই থেকে কোচবিহারের রাজ পরিবারের কেউই আর এই মন্দিরে আসেন না।

কামাখ্যা মন্দিরে পূজার ইতিহাস:

ইতিহাস অনুসারে জানা যায় যে, অনেক দিন আগে পূর্ব হিমালয়ের গাড়ো পাহাড়ে তারা দেবীর তান্ত্রিক পূজার প্রচলন ছিল, সেখানে আদিবাসীরা দেবীর যোনিকে কামাকি নামে পূজা করত।

ব্রাহ্মণ্য যুগে কালিকাপুরাণ  এ সব দেবীকেই মহাশক্তির অংশ বলে মনে করা হয়। সেই হিসেবে কামাখ্যাও মহাশক্তির অংশ হিসেবে পূজিত হন। হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী আষাঢ় মাসে মৃগশিরা নক্ষত্রের তিনটি পদ শেষ হলে পৃথিবী অথবা ধরিত্রী মা ঋতুমতি হন।

আর এই সময়ে অম্বুবাচী পালন করা হয়, এই উপলক্ষে বিশাল এক মেলার আয়োজন করা হয়। অম্বুবাচীর দিন থেকে মোট তিন দিন দেবী কামাখ্যার মন্দির সম্পূর্ণরূপে বন্ধ থাকে। সেই তিন দিন কোন মাঙ্গলিক কাজ করা যায় না। তার সাথে সাথে দেবীর দর্শন করাও নিষিদ্ধ থাকে।

চতুর্থ দিন দেবীর স্নান এবং পূজা সম্পূর্ণ হওয়ার পর মন্দিরে দেবী মূর্তি দর্শনের অনুমতি দেওয়া হয় ভক্তদের জন্য। অম্বুবাচীর শেষ দিন ভক্তদের রক্তবস্ত্র উপহার দেওয়া হয়। দেবী পীঠের সেই রক্ত বস্ত্র ধারণ করলে মনের সকল বাসনা, কামনা পূর্ণ হয় বলে বিশ্বাস করেন ভক্তরা।

অম্বুবাচীর মেলা আন্তর্জাতিক স্তরে বিখ্যাত বলাই যায়। মেলা কে কেন্দ্র করে যে বিশাল উৎসবের আয়োজন করা হয়। সেটিও কিন্তু দেখার মত, এই উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটক, পুণ্যার্থী ও ভক্তদের ঢল নামে এই মন্দির প্রাঙ্গণে।

কামাখ্যা মন্দিরের বর্ণনা:

প্রতিটি মন্দিরের আলাদা আলাদা রূপ ও সৌন্দর্য বিরাজমান। তেমনি এই কামাখ্যা মন্দিরের বর্ণনা অনুসারে জানা যায় যে, কামাখ্যা মন্দিরে চারটি কক্ষ আছে। গর্ভগৃহ ও তিনটি মন্ডপ। যে গুলির স্থানীয় নাম চলন্ত, পঞ্চরত্ননাট মন্দির

গর্ভগৃহটি পঞ্চরথ স্থাপত্য শৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছে। অন্যগুলির স্থাপত্য তেজপুরের সূর্য মন্দিরের সমতুল্য। এ গুলিকে খাজুরাহো অথবা অন্যান্য মধ্য ভারতীয় মন্দিরের আদলে নির্মাণ করা হয়েছে, তার সাথে খোদাই চিত্র দেখা যায় এই মন্দিরের গায়ে।

মন্দিরের চূড়াগুলি মৌচাকের মতো দেখতে লাগে। নিম্ন অসমের বহু মন্দিরে এই ধরনের চূড়া দেখা যায়। গর্ভগৃহটি আসলে ভূগর্ভস্থ একটি গুহা, এখানে কোনরকম মূর্তি নেই। শুধু একটি পাথরের সরু গর্ত দেখা যায়।

গর্ভগৃহটি ছোট এবং অন্ধকারে আচ্ছন্ন। খুবই সংকীর্ণ এবং খাড়াই সিঁড়ি পেরিয়ে এখানে পৌঁছাতে হয়। যা কিনা অনেকটাই দুর্গম জায়গা বলা যায়। ভিতরে ঢালু পাথরের একটি খন্ড আছে যেটি যোনি আকৃতি বিশিষ্ট। এটিতে প্রায় ১০ ইঞ্চি গভীর একটি গর্ত দেখা যায়।

একটি ভূগর্ভস্থ প্রস্রবনের জল বেরিয়ে এই গর্তটি কে সবসময় ভর্তি রাখে। এই শিলা খন্ডটি দেবী কামাখ্যা নামে পুজিতা হয়ে থাকেন এবং দেবীর পীঠ হিসেবে প্রসিদ্ধ রয়েছে। যেটি সতীর ৫১ টি শক্তি পীঠের মধ্যে একটি অন্যতম শক্তিপীঠ অথবা সতী পীঠ।

কামাখ্যা মন্দির নির্মাণের ইতিহাস:

কোনো তীর্থস্থান আর মন্দির কোন না কোন এক সময়ে কারো দ্বারা নির্মাণ করা হয়েছেলো, যা কিনা অনেক প্রাচীনকাল বা অনেক বছর আগে ঘটে থাকে। বর্তমান এই কামাখ্যা মন্দিরটি অথবা মন্দিরের ভবনটি অহোম রাজা দের রাজত্বকালে নির্মাণ করা হয়েছে বলে জানা যায়। এর মধ্যে প্রাচীন কোচ স্থাপত্যটির সযত্নে রাখা হয়েছে।

পরবর্তীতে ধ্বংসপ্রাপ্ত হলে ১৫৬৫ সাল নাগাদ কোচ রাজা চিলরায় মধ্যযুগীয় মন্দিরের স্থাপত্য শৈলী অনুসারে মন্দিরটি পুনরায় আবার নির্মাণ করে দেন। এখন যে মৌচাক আকারের চূড়াটি দেখা যায়, তার নিম্ন অসমের মন্দির স্থাপত্যের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মন্দিরের বাইরে গণেশ ও অন্যান্য দেব-দেবীদের মূর্তি খোদাই করা রয়েছে।

মন্দিরের তিনটি প্রধান কক্ষ, পশ্চিম দিকের কক্ষটি খুবই বড় এবং আয়তাকার, সাধারণত তীর্থযাত্রীরা এটি পূজার জন্য ব্যবহার করেন না। পরের কক্ষটি বর্গাকার এখানে দেবীর একটি ছোট্ট মূর্তি আছে। এই মূর্তিটি পরবর্তীকালে এখানে স্থাপন করা হয়েছে।

এই কক্ষের দেয়ালে নরনারায়ন অন্যান্য দেব-দেবী এবং তখনকার সময়ের সম্পর্কিত শিলালেখ খোদাই করা আছে। মাঝখানের কক্ষটি মূল গর্ভ গৃহে নিয়ে যায়। এটি গুহার আকৃতি বিশিষ্ট, এখানে কোন মূর্তি নেই তবে শুধুমাত্র যোনি আকৃতি বিশিষ্ট পাথর ও ভূগর্ভস্থ প্রস্রবণটি লক্ষ্য করা যায়।

প্রতিবছর গ্রীষ্মকালে অম্বুবাচী মেলার সময় কামাখ্যা দেবীর ঋতুমতী হওয়ার ঘটনাকে খুবই ভক্তির সাথে উদযাপন করা হয়। এই সময়ের মূল গর্ভ গৃহের প্রস্রবণের জল আয়রন অক্সাইড এর প্রভাবে লাল হয়ে থাকে। আর এর ফলে এটি ঋতুস্রাবের মতই দেখায়। আর প্রাচীন কাল থেকে এটিকে দেবীর ঋতুমতী হওয়ার সময় বলে মনে করা হয়।

কামাখ্যা  মন্দিরে পূজা অর্চনা:

এই মন্দিরের পূজা অর্চনার সাথে জড়িয়ে রয়েছে ছাগল বলি দেওয়ার রীতি। প্রাচীনকালে কামাখ্যা ছিল খাসি উপজাতির বলিদান এর জায়গা। এখনো পর্যন্ত বলিদান এখানে পূজার একটি বিশেষ অঙ্গ। এখানে অনেক ভক্তরাই দেবীর উদ্দেশ্যে ছাগল বলি দিয়ে থাকেন।

এই তীর্থস্থানে শক্তি হলেন কামাখ্যা এবং ভৈরব হলেন উমানন্দ। কালিকাপুরাণ অনুসারে জানা যায় যে, কামাখ্যা মন্দিরে পূজা করলে মনের সকল ইচ্ছা পূর্ণ হয়। শিবের তরুণী স্ত্রী ও মোক্ষদাত্রী শক্তি কামাক্ষা নামে পরিচিত। আসামের অন্যান্য দেব-দেবীদের মতো দেবী কামাখ্যার পূজাতেও আর্যঅনার্য সংস্কৃতির মিশ্রণ দেখা যায়।

দেবীকে যেসব নামে পূজা করা হয় তার মধ্যে অনেক স্থানীয় আর্যঅনার্য দেবদেবীর নাম জড়িয়ে রয়েছে। ইতিহাস অনুসারে জানা যায় যে, গারো উপজাতির মানুষেরা কামাখ্যা তে শুকর বলে দিত। এই প্রথা নরনারায়ন দ্বারা নিযুক্ত পুরোহিতদের মধ্যেও দেখা যায়।

এছাড়াও কামাখ্যা মন্দিরে পূজা বামাচারদক্ষিণাচার উভয় মতেই করা হয়ে থাকে। সাধারণত ফুল দিয়েই পূজা দেওয়া হয়। তবে মাঝেমধ্যে পশু বলি হয়ে থাকে এই মন্দিরে। স্ত্রী পশু বলি সাধারণত নিষিদ্ধ হলেও বহু পশুপালির ক্ষেত্রে এই নিয়মে ছাড় দেওয়া হয়েছে।

কামাক্ষ্যা মন্দির:

যেহেতু আমরা জানলাম যে, কামাক্ষ্যা মন্দিতে দেবীর গর্ভযোনি পতিত হয়ে গড়ে উঠেছে। সেই অনুসারে কালিকাপুরাণ মতে জানা যায় যে কামাক্ষ্যা মন্দিরে সতী শিবের সঙ্গে বিহার করেন। এখানে তার মৃতদেহের যোনি অংশটি বিষ্ণু সুদর্শন চক্র দ্বারা ছিন্ন হয়ে পতিত হয়েছিল। দেবী ভাগবত পুরাণের ১০৮ পীঠের তালিকায় যদিও এই তীর্থের কোন নাম উল্লেখ নেই।

তবে অপর একটি তালিকাতে কামাক্ষ্যা মন্দির অথবা কামগিরি শক্তি পীঠের এই নামের উল্লেখ পাওয়া যায়। যোগিনী তন্ত্র মতে কালিকা পুরাণের মতকে অগ্রাহ্য করে কামাক্ষ্যা কালী বলা হয়েছে এই দেবীকে, এবং যোনির প্রতীকতত্ত্বের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ভীষণভাবে।

কামগিরি শক্তিপীঠ অথবা কামাক্ষ্যা মন্দিরে উৎসব:

কমবেশি সকলেই হয়তো শুনে থাকবেন যে, তন্ত্রসাধনার কেন্দ্রবিন্দু এই তীর্থস্থান হল কামাক্ষ্যা। তন্ত্রসাধনার কেন্দ্র হওয়ার জন্য বার্ষিক অম্বুবাচী মেলা অনুষ্ঠানে এখানে প্রচুর মানুষের ঢল নামে।

এছাড়া বার্ষিক মনসা পূজাও খুবই ধুমধাম ভাবে আয়োজিত হয়। দুর্গাপূজা কামাক্ষ্যা মন্দিরের একটি অন্যতম প্রধান উৎসব বলা যেতে পারে। দুর্গাপূজার সময় মন্দিরের চারিদিকে পরিবেশ ও মন্দিরের পূজা অর্চনা সকলের নজর কাড়ে।

অনেকেই হয়তো শুনে থাকবেন যে, কামাক্ষ্যা দেবী হলেন তন্ত্র সাধনার দেবী তাই কামাক্ষ্যা হল তান্ত্রিকদের সাধনা স্থল যে জায়গায় যেতে গেলে গা ছমছম করেই। অনেক গল্প অনুসারে জানা যায় যে, এই জায়গাটি অনেকটাই ভয়ংকর, জাদু-টোনা, তন্ত্র-মন্ত্রের জায়গা।

এখানে আসে পাশের জঙ্গলে নির্জন পথে নাকি ডাকিনী- যোগিনী, ভূত- প্রেত এসবের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে এই ভয় পাওয়ার কিছু নেই, সবকিছুই গল্পে শোনা এবং কাহিনী অনুসারে জানা। তবে হ্যাঁ, এমন ঐশ্বরিক জায়গায় কোন অলৌকিক শক্তির অনুভব হতে পারে আপনার।

এখানকার নারীরা ছলা -কলা এবং কাম-কলায় নাকি ভীষণ পারদর্শী, যার ফলে পুরুষরা তাদের মায়াজালে পড়তে বাধ্য হন। তবে যাই হোক না কেন, এই তীর্থস্থানটি হিন্দুদের কাছে অনেকখানি পবিত্র একটি তীর্থস্থান। তার সাথে সাথে তান্ত্রিকদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র তীর্থক্ষেত্র।

সকলের মুখে শোনা কথা থেকে জানা যায় যে, এই কামাক্ষ্যা মন্দিরে দেবীর দর্শন, যোনি পীঠের দর্শন এর সাথে সাথে মনের সকল ইচ্ছা জানালে দেবী কখনোই কাউকে ফিরিয়ে দেন না, সকল মনের ইচ্ছা পূর্ণ হয়। আর সেই কারণে, জীবনকে চিন্তা মুক্ত, ঋণ মুক্ত এবং সুন্দর করে তোলার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে, এমনকি দেশের বাইরে থেকেও এই মন্দিরে ভক্তদের আনাগোনা লেগেই রয়েছে।

Leave a Comment