জামরুল চাষের পদ্ধতি – Jamrul Cultivation Method in Bangla

জামরুল হালকা মিষ্টি স্বাদ যুক্ত একটি রসালো গ্রীষ্মকালীন ফল । বসতবাড়ি বা আশেপাশে বা পুকুরের ধারে বিক্ষিপ্ত ভাবে দু একটি জামরুলের চারা দেখতে পাওয়া যায়। এটি ভিটামন বি ২ সমৃদ্ধ একটি ফল। এ ফলে প্রচুর পরিমানে জল থাকায় এটি ডায়াবেটিস রোগীদের তৃষ্ণা নিবারণে উপকারী। জামরুলে আমিষ, খনিজ লবন, ভিটামিন সি, লৌহ ও ক্যারোটিন রয়েছে।

আমাদের বাংলাভূমি সাইটে নিয়মিত আমরা আপনাদের সাথে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করে থাকি। এর ফলে আপনারা কৃষি জমি, শিক্ষা, অর্থনীতি এসব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে থাকেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রয়োজনে আপনারা এ সকল  তথ্য থেকে উপকৃত হয়ে থাকেন।

এরই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা আপনাদের সাথে জামরুল  চাষের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব। এতে করে আপনারা সহজেই জামরুল চাষের বিস্তারিত জানতে পারবেন।


চলুন দেখে নেই জামরুল  চাষের বিস্তারিতঃ 

জলবায়ুঃ 

জামরুল চাষ করার জন্য দরকার উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু। খুব বেশি গরম বা খুব বেশি ঠান্ডা দুটোই জামরুল গাছের জন্য ক্ষতিকর।


বংশবিস্তারঃ 

জামরুলের বংশবিস্তার কলমের মাধ্যমে করা যায়। গুটি কলম ও শাখা কলম এই দুই ভাবেই করা যায়। একবার ফল সংগ্রহ করার পর যখন গাছে নতুন করে পাতা গজাতে শুরু করবে তখন গাছে কলম করা উচিত। যদি শাখা কলম করা হয় তবে এক বছর বয়সী গাছ বাছাই করে নিতে হবে এবং মে মাস থেকে জুন মাসের মধ্যে কলম করতে হবে।

শাখা কলম করার জন্য বর্ষা মৌসুমের সময় চার থেকে পাচ টি পব© সহ ডাল কেটে পলিথিনে রাখতে হবে। ডাল রোপণ করার পর যদি ডাল থেকে নতুন কুঁড়ি বের হয় তখন তা পরের বছর মুল জমিতে বা মাদায় রোপণ করে দিতে হবে।


জমি নির্বাচন ও জমি তৈরিঃ 

প্রায় সব ধরনের মাটিতেই জামরুল চাষ করা যায়। তবে জামরুল চাষের জন্য দোআঁশ মাটি বেশি উপযোগী। জমি সুনিষ্কাশিত হতে হবে। বৃষ্টির জল জমে থাকে না এমন উঁচু অথবা মাঝারি উঁচু জমি জামরুল চাষের জন্য নির্বাচন করা উচিত। জমি চাষ দিয়ে অথবা কোদাল দিয়ে কুপিয়ে সমান করে নিতে হবে এবং আগাছা মুক্ত করে নিতে হবে।


রোপণ পদ্ধতিঃ 

জামরুল চাষের জন্য সমতল ভূমি দরকার হয়। সমতল ভূমিতে বর্গাকার বা ষড়ভূজ পদ্ধতিতে চারা রোপণ করতে হবে। জৈষ্ঠ্য মাসের মধ্য থেকে শ্রাবণ মাসের মধ্য পর্যন্ত জামরুলের চারা বা কলম রোপণ করার উপযুক্ত সময়। তবে জমিতে যদি জল সেচের সুবিধা থাকে তাহলে বৈশাখ মাস থেকে কার্তিক মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত জামরুলের চারা রোপণ করা যায়।


গর্ত তৈরিঃ 

জামরুল গাছের কলম রোপণের জন্য পনের থেকে বিশ ‍দিন আগেই গর্ত তৈরি করতে হবে। গর্তের আকার প্রতি ৬ মিটার দূরত্বে ১মি ×১মি×১মি করে রাখতে হবে। এর পর সার মিশিয়ে দিতে হবে। গর্তের উপরের মাটির সাথে ১৫-২০ কেজি জৈব সার দিতে হবে। এছাড়া ২৫০ গ্রাম টিএসপি, ২৫০ গ্রাম এমওপি এবং ১০০ গ্রাম জিপসাম সার ভালোভাবে মিশিয়ে দিয়ে গর্ত ভরাট করে দিতে হবে আর তাতে জল দিতে হবে।


গর্তে চারা বা কলম রোপণ ও পরিচর্যাঃ 

গর্তে সার প্রয়োগ করার দশ থেকে পনের দিন পর বাছাই কৃত কলমটি গর্তের মাঝে খাড়া ভাবে রোপন করতে হবে। তারপর তাতে প্রয়োজন মতো জল দিতে হবে এবং খুঁটি ও বেড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।


সার প্রয়োগঃ 

জামরুল গাছ বৃদ্ধির সাথে সাথে গাছে প্রয়োজনীয় পরিমানে সার প্রয়োগ করতে হবে। এক থেকে তিন বছর বয়সী গাছের জন্য গোবর দিতে হবে ১৫-২০ কেজি, ইউরিয়া প্রয়োগ করতে হবে ২০০-৩০০ গ্রাম, টিএসপি দিতে হবে ২০০-৩০০ গ্রাম এবং এমওপি সার দিতে হবে ১০০-২০০ গ্রাম। গাছ একটু বড় হলে অর্থাৎ চার থেকে সাত বছর বয়সী গাছের জন্য গোবর দিতে হবে ২৫-৩০ কেজি, ইউরিয়া ৪০০-৬০০ গ্রাম, টিএসপি লাগবে ৪০০-৫০০ গ্রাম এবং এমওপি দিতে হবে ৩০০-৪০০ গ্রাম। গাছের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সারের পরিমান বাড়বে।

সব টুকু সার দুই ভাগে ভাগ করে নিতে হবে। তারপর সেটা বৈশাখ মাস থেকে আষাঢ় মাসের মাঝ পর্যন্ত এবং ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি থেকে কার্তিক মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রয়োগ করতে হবে। প্রতি বার সার দেয়ার পর প্রয়োজন হলে জল সেচ দিতে হবে।


আগাছা দমনঃ 

জামরুল গাছের গোড়া সব সময় আগাছা মুক্ত রাখতে হবে। সাধারনত বর্ষাকালের শুরুর দিকে এবং বর্ষা শেষ হবার পর পুরো বাগানে হালকা চাষ দিয়ে আগাছা দমন করে দিলে ভালো ফলন পাওয়া যায়।


সেচ ও নিষ্কাশনঃ 

জামরুল ফলে জলের ভাগ বেশি থাকে তাই খরা মৌসুমে অবশ্যই সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে জলের অভাবে ফল আকারে ছোট হবে এবং ফল ঝরে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। সাধারনত খরা মৌসুমের সময় গাছে প্রয়োজন অনুযায়ী দুই থেকে তিন বার সেচ দিলেই হয়।

এত গুনগত মান সম্পন্ন ফল পাওয়া যায়। এছাড়া বর্ষা মৌসুমের সময় জমিতে প্রয়োজনীয় নালা কেটে দিতে হবে যেন গাছের গোড়া থেকে অতিরিক্ত জল বের হয়ে যেতে পারে।


অন্যান্য পরিচর্যাঃ 

মরা ডালপাতা ছেটে দিতে হবে। 


রোগবালাই দমনঃ 

জামরুল গাছে তেমন কোনো পোকামাকড় আক্রমণ করেনা তাই তেমন কোনো রোগ বালাই ও দেখা যায় না। তবে কচি পাতা খেয়ে ফেলা পোকা কখনও কখনও দেখা যায়। এদের দমন করার জন্য প্রতি লিটার জলের সাথে ২ মিলি সুমিথিয়ন মিশিয়ে নিয়ে পোকা আক্রান্ত গাছে স্প্রে করে দিতে হবে।


ফল সংগ্রহঃ 

ফল পরিপক্ক হবার পর সংগ্রহ করতে হবে। পরিপক্ক ফল গাঢ় তামাটে রং থেকে মেরুন রঙের হয়ে থাকে এবং পুষ্ট ও টসটসে হয়। ফল হাত দিয়ে সংগ্রহ করতে হবে অথবা জালিযুক্ত বাশের কোটার সাহায্যে ও সংগ্রহ করা যায়।


ফলনঃ 

ঠিকমত যত্ন নিলে জাত ভেদে প্রতি হেক্টরে ২০ মেট্রিক টন জামরুল পাওয়া যায়।

Leave a Comment