জামাই ষষ্ঠী 2022: ইতিহাস ও তাৎপর্য | Jamai Sasthi 2022: History and Significance

জামাই ষষ্ঠী 2022 (Jamai Sasthi 2022 Date Time and Significance) 2022 জামাই ষষ্ঠীর ইতিহাস এবং জানুন জামাই ষষ্ঠী কেন পালন করা হয়? জামাই ষষ্ঠীর তাৎপর্য কি? ভারতীয়দের জন্য জামাই ষষ্ঠীর গুরুত্ব কতটা? জানুন সবকিছু এখানে।

জামাইষষ্ঠী খুবই গুরুত্বপূর্ণ আর আনন্দের একটি উৎসব। বিভিন্ন উৎসবের বিভিন্ন রকমের গুরুত্ব রয়েছে। তাছাড়া প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাসে জামাই ষষ্ঠী পালন করা হয়। সে নতুন জামাই হোক অথবা বুড়ো জামাই, জামাইষষ্ঠীর প্রথা অনেক দিন আগে থেকে চলে আসছে।

জামাই ষষ্ঠী ইতিহাস ও তাৎপর্য - Jamai Sasthi History and Significance
জামাই ষষ্ঠী ইতিহাস ও তাৎপর্য – Jamai Sasthi History and Significance

জামাই ষষ্ঠীর কথা মনে হলে প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিভিন্ন রকমের ব্যঞ্জন রান্না করে শাশুড়ি মা জামাই এর অপেক্ষা করছেন। যেখানে কচি পাঁঠার মাংস, ইলিশের পেটি, আম, কাঁঠাল, আরো বিভিন্ন ফলমূল, আরো তরি তরকারি, মিষ্টি, দই আর না জানি কত কি, তাই তো !

তবে এই জামাই ষষ্ঠীর ইতিহাস ও তাৎপর্য নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকতে পারে মনে। কেন এই জামাইষষ্ঠী পালন করা হয়, কি আছে এর পিছনে রহস্য ! তো চলুন তাহলে জেনে নেওয়া যাক জামাইষষ্ঠীর ইতিহাস ও তাৎপর্য সম্পর্কে:- 

জামাইষষ্ঠীর ইতিহাস: 

মা ষষ্ঠীর সঙ্গে জামাই এর সম্পর্কটা কি, এই প্রশ্ন নিয়ে অনেকবার অনেকেই ভেবে থাকবেন। ভারতবর্ষ তথা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে একসময় এমন সংস্কার ছিল যে, কন্যা যতদিন না পর্যন্ত পুত্রবতী হবে ততদিন পর্যন্ত কন্যার পিতা অথবা মাতা কন্যা গৃহে কখনোই পদার্পণ করতে পারবেন না।

তবে এমনটা কি করে সম্ভব হতে পারে, যদি সেই কন্যা কন্যা সন্তান জন্ম দিয়ে থাকেন অথবা কোন সন্তান জন্ম হবার পরেই মৃত্যুবরণ করল, তাহলে কি সেই মেয়েটির বাবা-মা কখনোই সেই মেয়েটির বাড়িতে যেতে পারবেন না।

এমন অবস্থায় খুবই সমস্যা দেখা দিল, সন্তান ধারনের সমস্যা বা সন্তান মৃত্যু যেটাকে শিশু মৃত্যু বলা হয়, এর কারণে অনেকটা দিন অপেক্ষা করতে হতো বাবা মাকে তার কন্যার বাড়িতে যাওয়ার জন্য। এমন পরিস্থিতিতে সমাজের বিধানদাতা জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লা ষষ্ঠীকে বেছে নেওয়া হলো জামাইষষ্ঠীর দিন হিসাবে।

যেখানে মেয়ে জামাইকে নিমন্ত্রণ করে খুবই আদর করে ঘরেতে ডেকে আনা হয়, আর কন্যার মুখ দর্শন এমনিতেই হয়ে যাবে। আর সেই সঙ্গে মা ষষ্ঠীর পুজো করে তাকে খুশি করা, যাতে খুব শীঘ্রই তাদের কন্যা পুত্র সন্তান জন্ম দিতে পারেন।

তবে বর্তমানে অবশ্য এই সংস্কার পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছে। কন্যার পিতা-মাতা অথবা যেকোনো ব্যাক্তি কন্যা সম্প্রদান করবেন তিনি এক বছর কন্যার বাড়ি যাবেন না, বা গেলেও কন্যার বাড়ির অন্ন গ্রহনও করবেন না। যদিও আধুনিক শহরের জীবনযাত্রায় এই সংস্কার বিশেষভাবে গুরুত্ব পায় না।

কেন মেয়ে জামাইকে ডেকে এনে খুবই সমাদরে খাওয়া দাওয়া করানো, সেই সঙ্গে কন্যা যাতে খুব তাড়াতাড়ি  যাতে সন্তান জন্ম দিতে পারে সেই লক্ষ্যে মা ষষ্ঠীকে পুজো দিয়ে, এটি একটি উৎসবের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, এবং নাম দেওয়া হয়েছে জামাইষষ্ঠী অর্থাৎ জামাইকে মেয়েকে সমাদরে ঘরে ডেকে এনে তাদেরকে আপ্যায়ন করার সাথে সাথে মহাষষ্ঠীর পুজোটাও জড়িত রয়েছে, তাই সব মিলিয়ে এর নাম জামাইষষ্ঠী।

জামাইষষ্ঠীর তাৎপর্য: 

বিভিন্ন রকম কারণ হতে পারে, তবে তাৎপর্য নিয়ে অনেক মতভেদ রয়েছে। জামাইষষ্ঠীর খাবার ষষ্ঠী পালন সাধারণত করে থাকেন মেয়েরা। তাদের কাছে তাৎপর্য একেবারে অন্যরকম। কাহিনী অনুসারে জানা যায় যে, একটি পরিবারে দুটি বউ ছিল। ছোট বউ ছিল খুবই লোভী, বাড়ির মাছ, মাংস এবং অন্যান্য ভালো খাবার রান্না হলেই সে লুকিয়ে লুকিয়ে খেয়ে নিতো আর শাশুড়ির কাছে অভিযোগ করতো, সব কালো বেড়ালে খেয়ে নিয়েছে।

তাছাড়া আমরা সকলেই জানি যে বিড়াল হল মা ষষ্ঠীর বাহন। তাই বেড়াল মা ষষ্ঠীর কাছে অভিযোগ জানালো যে, সে চুরি না করেও চুরির দায় কেন নেবে। এর ফলে মা ষষ্ঠী খুবই রেগে গেলেন, যার ফলে ছোট বইয়ের একটি করে সন্তান হয় আর মা ষষ্ঠী তার প্রাণ হরণ করেন অর্থাৎ সেই সন্তান মৃত জন্মায় অথবা জন্ম নেওয়ার পরে মারা যায়।

এইভাবে চলতে চলতে ছোট বউয়ের সাত টি পুত্র সন্তান এবং একটি কন্যা সন্তানকে মা ষষ্ঠীর ফিরিয়ে নেন। ফলে স্বামী, শাশুড়ি এবং আরও অন্যান্যরা মিলে তাকে অলক্ষণা বলে গালিগালাজ করে বাড়ি থেকে একেবারে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেন।

অথচ বড় বউ পুত্র কন্যা নিয়ে সুখের ঘর সংসার করতে থাকে। ছোট বউ মনের দুঃখে বনে চলে গেলে সেখানে একা বসে কাঁদতে থাকে। অবশেষে মা ষষ্ঠী একজন বৃদ্ধার ছদ্মবেশে তার কাছে এসে ছোট বইয়ের কান্নার কারণ জানতে চাইলেন। সে তার দুঃখের কথা সবিস্তারে মা ষষ্ঠীকে জানাল।

পূর্বের ঐ সমস্ত অন্যায় আচরণের কথা বলার পর ছোট বউ মা ষষ্ঠীর কাছে ক্ষমা চায় আর ষষ্ঠী ও তাকে ক্ষমা করে দেন। এর পরে বলেন ভক্তি ভরে ষষ্ঠীর পুজো করলে সাত টি পুত্র এবং একটি কন্যার জীবন ফিরে পাবে। তখন ছোট বউ সংসারে ফিরে এসে ঘটা করে মা ষষ্ঠীর পূজা করে ক্রমে ক্রমে ফিরে পায় সন্তান।

এর ফলে চারিদিকে ষষ্ঠী পূজার মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে, আর এটাই ছিল জামাইষষ্ঠী অথবা অরণ্য ষষ্ঠী যাই বলুন না কেন, এর ব্রত কথার মূল গল্প। আবার অন্যদিকে যে সময় জামাইষষ্ঠী পালন করা হয় জৈষ্ঠ মাসে, সেই সময় প্রকৃতিতে আম, জাম, কাঁঠাল, বিভিন্ন রকমের ফলের সমারোহ দেখা যায়। তাই জামাই মেয়েকে সমাদরে খাওয়ানোর জন্য এই আম, জাম, কাঁঠাল তো বাড়িতে থাকবেই থাকবে, তাই নয় কি !

সেই কারণে খুবই ধুমধাম করে এই দিনটিতে শাশুড়িরা জামাই এবং মেয়ের মঙ্গল কামনায় ষষ্ঠীর পুজো করেন। তারপর নেমন্তন করে নিয়ে আসা জামাইকে আসনে বসিয়ে প্রথমে কপালে দইয়ের খোটা দিয়ে আশীর্বাদ করেন ও দীর্ঘ জীবন কামনায় মা ষষ্ঠীর কাছে রাখা তেল হলুদে মাখা সুতো হাতের কবজিতে বেঁধে দেন। এরপর আশীর্বাদ করা জামা কাপড় জামাই এর হাতে তুলে দেন।

তবে অন্যদিকে জামাইরাও যখন এই দিনে শ্বশুর বাড়িতে যান তখন কিন্তু বিভিন্ন রকমের মিষ্টি, ফলমূল এবং শাশুড়ি মায়ের জন্য নতুন কাপড় নিয়ে যান। কেননা প্রণাম করার পর আশীর্বাদ হিসেবে যখন শাশুড়ি মা আশীর্বাদ করবেন তখন এই নতুন জামা কাপড় শাশুড়ি মায়ের হাতে জামাইরা তুলে দেন।

জামাইদের সাথে সাথে মেয়েরাও কিন্তু বাপের বাড়ি থেকে কাপড় উপহার পেয়ে থাকে। এছাড়া দিন বদলের সাথে সাথে জামাইষষ্ঠী একটি প্রথা হিসেবে পরিচিত হয়ে গিয়েছে। বৈদিক যুগ থেকেই জামাইষষ্ঠী পালন হয়ে আসছে। প্রতি বছর জৈষ্ঠ মাসের ষষ্ঠী তিথিতে প্রথম প্রহরে ষষ্ঠী পূজার আয়োজন করা হয়।

বিশেষ করে যে পরিবারের সবে মাত্র সদ্য বিবাহিতা কন্যা রয়েছে, সেই পরিবারে এই পার্বণটি আরো বেশি ধুমধাম ভাবে ঘটা করে পালন করা হয়, পুজোর সময় পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য পৃথক পৃথক থালিতে নতুন বস্ত্র, ফলমূল, পান – সুপারি, ধান, দূর্বা এবং তালের পাখা রাখা হয় যদিও বর্তমানে এখন বিদ্যুতের পাখা চলে তবুও তালের পাখা জামাই ষষ্ঠীর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, আর ট্র্যাডিশনাল হিসাবেও খুবই মানায় ও।

মেয়ের জীবন সুন্দর হওয়ার আশায় মেয়ের মা জামাইকে আপ্যায়ন করে ষষ্ঠীর পূজার মধ্যে দিয়ে মেয়ের মুখ দেখা, জামাই আদর, তার সাথে মেয়ে যাতে তাড়াতাড়ি সন্তান সম্ভবা হতে পারে সেই মনোকামনা পূর্ণ করার লক্ষ্যে জামাইষষ্ঠী আজও বাঙ্গালীদের কাছে বেশ ঐতিহ্যময় উৎসব। সংস্কার, রীতিনীতি, ভালোবাসা, দায়িত্ব, সবকিছু মিলিয়ে জামাইষষ্ঠী হয়ে ওঠে বাঙালি দের কাছে খুশির আমেজে ভরা সুন্দর একটি মিষ্টি উৎসব।

Leave a Comment