হোলি 2022: ইতিহাস ও তাৎপর্য | Holi 2022: History and Significance

হোলি 2022 (Holi 2022 Date Time and Significance) 2022 হোলির ইতিহাস এবং জানুন হোলি কেন পালন করা হয়? হোলির তাৎপর্য কি? ভারতীয়দের জন্য হোলির গুরুত্ব কতটা? জানুন সবকিছু এখানে।

বসন্ত ঋতুতে সেজে ওঠে পরিবেশ, তার সাথে সাথে শুরু হয় দোল পূর্ণিমার আমেজ। যেখানে সমস্ত অন্ধকার কেটে গিয়ে শুভ সূচনা ঘটে। আর রামধনুর বিভিন্ন রঙের খেলায় মেতে ওঠে সাধারণ মানুষ। গ্রাম বাংলার সাথে সাথে শহর এবং পৃথিবীর আরো অন্যান্য প্রান্তেও এই দোল উৎসব জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে পালন করা হয়

উৎসব মানে আমরা বুঝি অপার আনন্দ, কোনরকম দুঃখ, যন্ত্রণা সেখানে স্থান পায় না। ছোট বড়, ধনী-দরিদ্র, নির্বিশেষে সকলেই সেই উৎসবে গা ভাসিয়ে থাকেন। তবে এখানে বিশেষ করে হোলি উৎসব যা কিনা রঙের উৎসব মানুষের মনে বিভিন্ন রকমের রংয়ের ছোঁয়া লাগিয়ে সবাইকে একই বন্ধনে বাঁধে।

হোলি ইতিহাস ও তাৎপর্য - Holi History and Significance
হোলি ইতিহাস ও তাৎপর্য – Holi History and Significance

যেকোনো উৎসব মানেই কিন্তু আনন্দ, আর যদি সেই উৎসবটি হয় রংয়ের উৎসব তাহলে তো আর কথাই নেই। ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমার দিনে বা মার্চ মাসের মাঝামাঝিতে বসন্তের এই রঙিন উৎসবটি পালন করা হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় এই উৎসব পালিত হয়। এটি একটি বাঙালি দের কাছে দোলযাত্রা অথবা বসন্ত উৎসব নামেও পরিচিত যেটা আমরা সচরাচর হোলি নামে জানি।

ভারতীয়দের কাছে এই হোলি উৎসব একটি অত্যন্ত আনন্দের উৎসব নামে পরিচিত। ভারত ছাড়াও পৃথিবীর আরো অন্যান্য প্রান্তে আনন্দের সাথে বিভিন্ন রং এবং ফুলের উৎসব পালন করা হয়। এই হোলি বা দোলযাত্রা হচ্ছে ভক্ত এবং ভগবান শ্রীকৃষ্ণের নিকট আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটানোর একটি সুন্দর উৎসব।

বিশেষ করে বৃন্দাবন ধামে এই উৎসবটি জাঁকজমপূর্ণ ভাবে পালন করা হয়। এখনো পর্যন্ত সেখানে এমনভাবে হোলি উদযাপন করা হয় যেন শ্রীকৃষ্ণ সেখানেই এখনো পর্যন্ত বিরাজমান আর সেখানে সেখানকার মানুষজন সম্পূর্ণ রূপে আগেকার প্রাচীনকালের হোলি উৎসব এর মত হোলি উৎসব পালন করে থাকেন।

এই হোলি উৎসবের পিছনে আছে এক ইতিহাস। সেই ইতিহাস সম্পর্কে জানা যাক:- 

হোলি উৎসবের ইতিহাস: 

আমরা ছোট থেকে দেখে আসছি এই দিনটিতে রং দিয়ে খেলা হয়। আর যাকে আমরা হোলি উৎসব বলে জানি কিন্তু আমরা কখনোই খেয়াল করিনি যে এই উৎসবের পিছনে কি এমন রহস্য আছে বা ইতিহাস আছে ? সেটা হয়তো অনেকেই জানেন আবার অনেকেরই এটা একেবারেই অজানা।

হোলি হল হিন্দু সমাজের প্রাচীনতম একটি উৎসব যা যিশুখ্রিস্টের জন্মের প্রায় ৩০০ বছর আগে হর্ষবর্ধন নামে কোন এক রাজা এই হোলি উৎসব পালন করতেন, আর আল বিরুনীর বিবরণ থেকে তথ্য পাওয়া যায় যে, মধ্যযুগের কোন কোন অঞ্চলে মুসলমানরাও নাকি এই হোলি উৎসবের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

মধ্যযুগের এই সময় এই উৎসবকে হোলিকা  উৎসব বলে সবাই জানতো। কেননা স্কন্দ পুরাণে হোলি উৎসবের সূচনা সম্পর্কে জানা যায় যে, হিরণ্যকশিপু নামে এক রাজা তার নিজের পুত্র সন্তানকে হত্যা করার প্রচেষ্টা করলে সেই প্রচেষ্টাতে তার বোন হলিকাকে নিযুক্ত করেছিলেন, আর সেই হোলিকা আগুনে পুড়ে মারা গিয়েছিল প্রহ্লাদকে হত্যা করার জন্য, সে ক্ষেত্রে প্রহ্লাদ এর কোনরকম ক্ষতি হয়নি। সেই থেকে হোলিকা দহনের মধ্যে দিয়ে যেটাকে আমরা ন্যাড়া পোড়া বলে জানি তারপরের দিন হয় হোলি উৎসব।

হোলিতে বিভিন্ন ধরনের রং কেন ব্যবহার করা হয়?

দোল পূর্ণিমার দিন প্রতিটি বাঙালির মনে রঙের ছোঁয়া লাগে, এই দোল উৎসবের অপেক্ষায় সারা বছর ধরে অনেকেই অধীর আগ্রহে থাকেন। পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে বসন্ত উৎসব হিসেবে আনন্দের সাথে পালন করা হয় এই হোলি উৎসবটি। এই পবিত্র দিনটি প্রত্যেক ভারতীয়রা খুবই সামঞ্জস্য ভাবে পালন করে থাকেন বিভিন্ন রকম রং এর সাথে হোলি খেলে।

বৈষ্ণব তত্ত্বসূত্রে দোল পূর্ণিমার দিনে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার প্রিয়তমা রাধা ও অন্যান্য গোপিনীদের সাথে আবির খেলায় মগ্ন হয়েছিলেন। তাই এই দিনটিকে অনুসরণ করে  সমস্ত মানুষ রং খেলায় মেতে ওঠেন যা কিনা প্রেমের উৎসব বলে অনেকেই জানেন এই দোল উৎসব অথবা হোলির উৎসবকে।

অনেকদিন আগের কথা যখন বর্তমান দিনের মতো বিভিন্ন ধরনের এমন রং ছিল না। তখন মানুষ নিম, হলুদ, পলাশ এবং গাছের রং ব্যবহার করে হোলি খেলা করতেন। তারা প্রাকৃতিক ভাবে ফুল, ফল, গাছের বিভিন্ন অংশ থেকে বিভিন্ন রকমের আবির, রং তৈরি করতেন যা ছিল সবদিক থেকে সুরক্ষিত এবং আনন্দমুখর। কেননা অনেকদিন আগে থেকে এই রং গুলি তৈরি করতে ব্যস্ত থাকতেন তারা।

বসন্ত ঋতুতে এই হোলি উৎসব হয় বলে, চারিদিকে বিভিন্ন ধরনের ফুলের সমারোহ চোখে পড়ার মত। চারিদিক যেন পরিবেশ সেজে ওঠে বিভিন্ন রঙে। ধানের ক্ষেত ভরে ওঠে, চারিদিকে ফুল ফোটে সে বন্যফুল হোক অথবা নাম জানা ফুল।

হোলি উৎসবের তাৎপর্য: 

আমরা সকলেই জানি যে, হোলি উৎসব রঙের উৎসব যা কিনা একদিকে ভালবাসার উৎসব যেখানে সকলেই আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে থাকেন। বলা যেতে পারে জীবনে ছন্দ, রং, প্রেম, প্রীতি না থাকলে সে জীবন সাদাকালো তে পরিণত হয়। যেটা মানুষকে জীবন বিমুখ করে তোলে। সুন্দরভাবে বাঁচার জন্য যা যা প্রয়োজন তার মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো রঙ্গিন জীবনযাত্রা। যার মধ্যে দিয়ে এই হোলি উৎসব সবার মধ্যে আনন্দ, প্রেম, প্রীতি, ছড়িয়ে দেয়।

এছাড়া বলা যেতে পারে হোলির আগের দিন হোলিকা দহনের মাধ্যমে অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটিয়ে শুভ শক্তি কে আহবান জানানো এবং পরের দিন হোলি খেলার মধ্যে দিয়ে জীবনকে আরো বেশি সুন্দর ও রঙিনময় করে তোলার জন্য এই উৎসব মানুষের জীবনে অনেক খানি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তাইতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথায় “ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল লাগলো যে দোল স্থলে জলে বন স্থলে লাগল যে দোল দ্বার খোল দ্বার খোল, ওরে গৃহবাসী।” কি? শান্তিনিকেতনের সেই আমেজ মনে পড়ে গেল তাই তো ! দোল উৎসবে এমন কোন মানুষ নেই যার শরীরে রঙের ছোঁয়া নেই, বিভিন্ন রঙের আবির, রং সবকিছু দিয়ে এই দিনটি একেবারে রঙিন হয়ে ওঠে। আকাশে বাতাসে মাটিতে সব জায়গায় রঙের ছোঁয়া। আমাদের সাথে সাথে পরিবেশ ও যেন দোল উৎসবে মেতে ওঠে।

সকাল থেকে গুরুজনদের পায়ে আবির দিয়ে প্রণাম করা তারপর বালতিতে রং গুলে সবার গায়ে দেওয়ার আনন্দ সারা জীবনেও ভোলার নয়। বিভিন্ন রকমের রান্না বান্না, মিষ্টি, পাপড়, নারকেল নাড়ু আরো অন্যান্য খাবার বাড়িতে মায়ের হাতে তৈরি হয়, যা দোল পূর্ণিমাকে আরো বেশি সুমধুর করে তোলে। আবির খেলা, রং খেলা তার সাথে সাথে মিষ্টি মুখ চলে সারা দিন ধরে। ছোট্ট শিশুদের আনন্দের বাঁধ ভেঙে যায়, তার সাথে সাথে বড়রাও এই দিন সবকিছু ভুলে বাচ্চাদের মতোই রং খেলায় মেতে ওঠেন।

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান: 

হোলি উৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন জায়গায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলে, যেখানে মেয়েরা হলুদ রঙের পোশাক পরে গাঁদা ফুল এর গয়নায় সুসজ্জিত হয়ে নৃত্য পরিবেশন করে থাকেন। যে অনুষ্ঠান দোল পূর্ণিমা অথবা হোলি উৎসবকে অনেকখানি আনন্দ মুখরিত করে তোলে।

বিশেষ করে গ্রাম বাংলার মানুষ জন এই অনুষ্ঠান খুবই উপভোগ করে থাকেন। অনেক জায়গায় তো খুবই বড় আকারে এমন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

Leave a Comment