ফুলকপি চাষের পদ্ধতি এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

ফুলকপি শীতের প্রধান জনপ্রিয় সবজি। তরকারি বা কারি ও স্যুপ তৈরি করে, বড়া ভেজে ফুল কপি খাওয়া হয়। তবে শীতের সবজি হলে ও ফুল কপি এখন গ্রীষ্মকালে ও উৎপাদিত হচ্ছে। ফুলকপিতে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের খনিজ উপাদান। 

আমাদের বাংলাভূমি সাইটে নিয়মিত আমরা আপনাদের সাথে নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করে থাকি। এর ফলে আপনারা কৃষি জমি, শিক্ষা, অর্থনীতি এসব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করে থাকেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রয়োজেনে আপনারা এ সকল  তথ্য থেকে উপকৃত হয়ে থাকেন।

এরই ধারাবাহিকতায় আজ আমরা আপনাদের সাথে ফুল কপি   চাষের পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করব। এতে করে আপনারা সহজেই ফুল কপি  চাষের বিস্তারিত জানতে পারবেন।

চলুন দেখে নেই ফুল কপি  চাষের বিস্তারিতঃ 

জলবায়ু  ও মাটিঃ 

ফুল কপি চাষের জন্য সুনিষ্কাশন যুক্ত উর্বর দোআঁশ ও এটেল মাটি সবচেয়ে ভালো। ফুল কপির জন্য ঠান্ডা ও আর্দ্র জলবায়ু ভালো। উঁচু জমি যেখানে জল জমে না এবং সারা দিন রোদ পায় এরূপ জায়গা ফুল কপি চাষের জন্য উত্তম।

ফুল কপি চাষের মাটিতে যত জৈব পদার্থ থাকবে ফলন ততই ভালো হবে। মাটির অম্লমান বা পি এইচ ৬-৬.৫ ফুল কপি চাষের জন্য উত্তম।

চারা তৈরিঃ

ফুল কপির চারা বীজতলায় উৎপাদন করে জমিতে লাগানো হয়। বীজতলার আকার ১ মিটার পাশে ও লম্বায় ৩ মিটার হওয়া উচিত। সমপরিমাণ বালি, মাটি ও জৈবসার মিশিয়ে ঝুরঝুরা করে বীজতলা তৈরি করতে হয়।

দ্বিতীয় বীজতলায় চারা রোপণের আগে ৭/৮ দিন পূর্বে প্রতি বীজতলায় ১০০ গ্রাম ইউরিয়া, ১৫০ গ্রাম টিএসপি ও ১০০ গ্রাম এমওপি সার ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। পরে চারা ঠিকমতো না বাড়লে প্রতি বীজতলায় প্রায় ১০০ গ্রাম পরিমাণ ইউরিয়া সার ছিটিয়ে দিতে হবে।

চারা রোপণ ও রোপণ দূরত্বঃ 

বীজ গজানোর ১০-১২ দিন পর গজানো চারা দ্বিতীয় বীজতলায় স্থানান্তর করতে হয়। চারায় ৫-৬ টি পাতা হলেই তা রোপণের উপযুক্ত হয়। সাধারনত ৩০-৩৫ দিন বয়সের চারা রোপন করা হয়।

সারি থেকে সারির দূরত্ব হবে ৬০ সেমি বা ২ ফুট এবং প্রতি সারিতে চারা থেকে চারার দূরত্ব হবে ৪৫ সেমি বা দেড় ফুট। চারা রোপণের সময় সাবধান থাকতে হবে যেন শিকড় মুচড়ে বা বেঁকে না যায়। তাহলে মাটিতে চারা বাড়তে সময় বেশি লাগবে এবং বৃদ্ধি কমে যাবে।

সার ব্যবহারঃ 

পচা গোবর জমি তৈরির সময় ৫০ কেজি দিতে হবে। প্রতি শতকে ইউরিয়া শেষ চাষের সময় ২৫০ গ্রাম, তার ২০ দিন পর ৫০০ গ্রাম এবং ৩৫ দিন পর ২৫০ গ্রাম।

টিএসপি শেষ চাষের সময় ৭০০ গ্রাম দিতে হবে। এমপি শেষ চাষের সময় ২০০ গ্রাম, ২০ দিন পর ৩০০ গ্রাম এবং ৩৫ দিন পর ২০০ গ্রাম। জিপসাম জমি তৈরির সময় ৪০০ গ্রাম দিতে হবে। জিংক সালফেট শেষ চাষের পর ৪০ গ্রাম দিতে হবে।

সার প্রয়োগের নিয়মঃ 

জমি তৈরির সময় অর্ধেক গোবর সার , পুরো টিএসপি, অর্ধেক এমওপি এবং বোরন সার প্রয়োগ করতে হবে। বাকি অর্ধেক গোবর সার চারা রোপণের ১ সপ্তাহ আগে মাদায় দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে হবে। এরপর চারা রোপন করে সেচ দিতে হবে। ই

উরিয়া এবং বাকি অর্ধেক এমওপি ও বোরন সার ৩ কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। প্রথম কিস্তির সার দিতে হবে চারা রোপণের ৮-১০ দিন পর, দ্বিতীয় কিস্তির সার দিতে হবে চারা রোপণের ৩০ দিন পর এবং শেষ কিস্তির সময় সার দিতে হবে ৫০ দিন পর।

তবে পুরো বোরাক্স বা বোরন সার জমি তৈরির সময় দিয়ে দিলে ও অসুবিধে নেই। আর সে সময় দিতে না পারলে পরবর্তীতে ১ম ও ২য় কিস্তিতে সার দেওয়ার সময় প্রতি ১০ লিটার জলে ১০-১৫ গ্রাম বোরিক পাউডার গুলে পাতায় স্প্রে করে দেওয়া যায়।

সেচ ও আগাছা ব্যবস্থাপনাঃ 

সার দেওয়ার পর পরই সেচ দিতে হবে। এছাড়া জমি শুকিয়ে গেলে সেচ দিতে হবে। জমিতে জল বেশি সময় ধরে যেন জমে না থাকে সেটা ও খেয়াল করতে হবে। সার দেওয়ার আগে মাটির আস্তর ভেঙ্গে দিতে হবে এবং নিড়ানি দিয়ে আগাছা পরিষ্কার করে দিতে হবে।

বিশেষ পরিচর্যাঃ 

ফুল কপি গাছের সারির মাঝে সার দেওয়ার পর সারির মাঝখানের মাটি তুলে দুপাশ থেকে গাছের গোড়ায় টেনে দেয়া যায়। এতে সেচ ও নিকাশের সুবিধা হয়। হবে ফুল কপির ফুল সাদা রাখার জন্য কচি অবস্থায় চারদিক থেকে পাতা টেনে বেuধে ফুল ঢেকে দিতে হবে। সূর্যের আলো সরাসরি ফুলে পড়লে রং তথা ফুল কপির রং হলুদাভ হয়ে যাবে।

রোগ দমন ব্যবস্থাঃ 

ফুল কপিতে বেশ কয়েকটি ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয় ঘটিত রোগ দেখা যায়। এর মধ্যে ধ্বসা রোগ, ক্লাব রট, ডাউনি মিলডিউ, পাতা পচা রোগ উল্লেখযোগ্য।

ধ্বসা রোগ ঠেকাতে ডায়াযেন এম ৪৫ এর ০.২ শতাংশ দ্রবণে মাটি ভিজিয়ে নিতে হবে। পাতা পচা রোগ ঠেকাতে ব্যাকটেরিয়া নাশক দিয়ে বীজ শোধন করে নিতে হবে। এক ধরনের মাছির শুককীট রয়েছে যারা শিকড় খেয়ে ফেলে। এতে গাছ শুকিয়ে যায় । এ ধরনের সমস্যা হলে ম্যালাথিয়ন ০.০২ শতাংশ দ্রবণ স্প্রে করতে হবে।

ফসল তোলা ও ফলনঃ 

রোপণের আড়াই থেকে তিন মাস পর ফুল কপি সংগ্রহ করতে হবে। সাদা রং ও আটো সাটো থাকতেই ফুল কপি তুলে ফেলা উচিত। মাথা ঢিলা ও রং হলদে ভাব ধরলে দাম কমে যায়। একর প্রতি ফলন ১৫-২৫ টন, হেক্টরে ৩৫-৬০ টন।

আজ আমরা ফুল কপি  চাষ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলাম। আগামীতে আপনাদের সাথে ফুল কপি চাষ নিয়ে আরো কিছু আলোচনা করবো, তাই আমাদের পেজে নিয়মিত চোখ রাখুন।

এই লেখাটি অনেকের কাজে লাগতে পারে তাই লেখাটি যতটুকু সম্ভব শেয়ার করুন। যাতে করে এই লেখা থেকে শিক্ষা নিয়ে ফুল কপি  চাষ করে অনেকেই আয় করার ব্যবস্থা করতে পারে।

Leave a Comment